মাহফুজ রাজা,স্টাফ রিপোর্টার: ইংরেজ শাসনামলে ইংরেজদের অত্যাচারের মধ্যে একটি হলো নীলচাষিদের ওপর নির্মম নির্যাতন। দেশের বিভিন্ন স্থানে এখনও সেই অত্যাচারের সাক্ষী হিসেবে টিকে আছে নীলকুঠির ধ্বংসাবশেষ।
জীর্ণশীর্ন ইট দেয়ালের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে আছে নারীদের সম্ভ্রম হারানোর আর্তচিৎকার আর মুসলিমদের উপর শোষণ নিপিড়নের হৃদয় বিদারক কাহিনী।
ইংরেজদের নীলকুঠি ছিল একটি সাহেব বাড়ি, যেখানে নীলচাষ দেখাশোনা করার জন্য ব্রিটিশ শাসকরা থাকতেন এবং নীলচাষিদের উপর অত্যাচার করতেন। এই কুঠিগুলো ছিল তাদের শোষণ ও নিপীড়নের কেন্দ্রবিন্দু।বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নীলকুঠী দেখতে লেগেই থাকে পর্যটকদের ভিড় আর ঘৃণার সাথে স্মরণ করে ইংরেজ শাসনের কথা।
নীল চাষের নির্মম ইতিহাস বিজড়িত কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরের ঐতিহাসিক নীলকুঠি বাড়ির ধবংসাবশেষ আজও কালের সাক্ষি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে,হোসেনপুর উপজেলার সিদলা ইউনিয়নের চৌদার (সাহেবের গাঁও) এলাকায় নীলকরদের বাড়ি এবং টান সিদলা গ্রামে নীলকুঠির কার্যালয় ও পুরাতন পুকুরটি নীলকর সাহেবদের নানা স্মৃতি আজও বহন করে চলেছে।
স্থানীয় কলামিস্ট এস এম মিজানুর রহমান মামুন প্রতিবেদককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন,
বাংলার তদানীন্তন সুলতান আলা উদ্দিন হোসেন শাহের নামানুসারে হোসেনপুর পরগনার ব্রহ্মপুত্র নদের পুর্ব তীরে গড়ে উঠেছিল নীলকুঠি। আনুমানিক ১৭৩০ থেকে ১৭৬০ খ্রিষ্টাব্দে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নীলকুঠি প্রতিষ্ঠা করে নীলের আবাদ শুরু করে। এক সময় এখান থেকে ইংল্যান্ডে প্রচুর নীল রপ্তানি করা হতো। প্রথম দিকে ইংরেজরা নীলের ব্যবসায় লাভ করলেও পরে ব্যবসায় ধস নেমে আসে।নীলকর ওয়াইজস্টিফেন্স ছিলেন এর মালিক ও ব্যবসায়ী। প্রাচীন ঢাকার আরমানিটোলার আর্মানিয়ান ইংরেজ খ্রিষ্টান আর্মোনিয়ান আরাতুন দুই কন্যা ও তার আত্বীয়-স্বজনদের নিয়েই হোসেনপুরে নীলকুঠির ব্যবসা চালু করেন। তখনকার সময়ে এ অঞ্চলে বাধ্যতামূলকভাবে চাষিদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হতো নীল চাষ।এসব ঐতিহাসিক বিষয় প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষের মনে বাঁচিয়ে রাখতে সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত সংশ্লিষ্টদের।
স্থানীয়দের কাছে জানা যায় জনশ্রুতি রয়েছে, ইংরেজ আমলে ফ্রান্সের অধিবাসী মাইকেল প্যাটেল চৌদার এলাকায় কারুকার্যময় একটি বাড়ি তৈরি এবং এলেনবেথ হেনসন জমিদার আমলে এ অঞ্চল নিয়ন্ত্রন করতেন।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়- জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর এ বাড়িটি এ জেলার সাবেক সমবায় অফিসার মরহুম উম্মেদ আলী খরিদ সূত্রে মালিকানা লাভ করেন। বাড়িটি দেখতে খুবই সুন্দর। বর্তমান বাড়িটি আমেনা মঞ্জিল হিসেবে পরিচিত।অসংখ্য দর্শনার্থী,ইউটিউবার টিকটকার ও ব্লগারদের পছন্দের স্থান এটি।
সরেজমিনে চোখে পড়ে, টান সিদলা বাবুর বাজার এলাকায় নীলকর কার্যালয়ের ধংসাবশেষ ও কার্যালয়ের পূর্ব দিকে সে আমলের একটি পুকুর রয়েছে। সে সময় এ অঞ্চলে শুকনা মৌসূমে পানির সংকট থাকায় নীল চাষের সুবিধার্থে বিরাট পুকুর খনন করা হয়।তার কাছেই রয়েছে বাবুরহাট যদিওবা আজ এখানে শোভা পাচ্ছে আশ্রয়ন প্রকল্পের ঘর। এলাকাটি আজও নীলের কুঠি হিসেবে পরিচিত। হোসেনপুরের সিদলা, পিতলগঞ্জ, হারেঞ্জা, চৌদার, রানী খামার, সাহেবেরচর এলাকায় আজও ইংরেজ পাদ্রী,পিতল সহ অন্যান্য খ্রিষ্টান নীলকরদের কিংবদন্তি কাহিনী এ অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।
স্থানীয় বীরমুক্তিযোদ্ধা আবুল হাসিম মাখন বলেন,
উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের কালো অধ্যায় নীল চাষ। এ অঞ্চলের কৃষকদের দিয়ে উদ্ভিদটির আবাদ অলাভজনক হওয়া সত্ত্বেও বাধ্য করা হতো। নীলকর সাহেবদের আদেশ পালনে পান থেকে চুন খসলেই চাষিদের ওপর নেমে আসত নির্যাতনের খণ্ড। নীলকুঠিতে নিয়ে চালানো হতো নির্মম নির্যাতন। কুঠিগুলো নীল চাষ পরিচালনা ও তত্ত্বাবধানে করা হলেও দিনে দিনে তা হয়ে ওঠে ব্রিটিশ শাসকদের টর্চার সেল। নীল চাষ এখন নেই, বিদায় হয়েছে নীলকরও। কিন্তু তাদের অন্ধকার গলির সাক্ষী হয়ে আছে নীলকুঠি।