বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৫ সালের ১৫ আগস্ট ছিল এক ভিন্ন বাস্তবতায় পালিত একটি তারিখ। এবার শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে সরকারি পর্যায়ে কোনো ‘জাতীয় শোক দিবস’ পালিত হয়নি—এটি ছিল জুলাই বিপ্লবের অন্যতম প্রতিশ্রুতি: একদলীয় শাসনের স্মারক দিনগুলোকে আর রাষ্ট্রীয়ভাবে গৌরবের আসনে না রাখা।
কিন্তু এই দিনটি ঘিরে নতুন এক বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ে—বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেশের শোবিজ অঙ্গনের অনেক তারকা, জনপ্রিয় মুখ এবং কথিত ‘অরাজনৈতিক’ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা হঠাৎ করেই শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মরণ করে শোক জানাতে শুরু করেন। তারা ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও অন্যান্য মাধ্যমে একযোগে ‘শ্রদ্ধা’ প্রকাশ করেন, যা সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক প্রশ্ন ও প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়।
নির্বাচনের আগে ও পরে দেখা গেছে, শোবিজ অঙ্গনের অনেকেই রাজনৈতিক বিষয়ে প্রকাশ্যে অবস্থান নিতে অনীহা প্রকাশ করেন। অথচ এবার ১৫ আগস্ট উপলক্ষে তারা যেভাবে শেখ মুজিবুর রহমানকে কেন্দ্র করে একধরনের ‘একমাত্রায়িত শ্রদ্ধা’ জানাতে শুরু করলেন, তাতে ধারণা তৈরি হয়েছে যে এটি নিছক আবেগ নয়—বরং সুপরিকল্পিত মনস্তাত্ত্বিক প্রচারণা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই শোক প্রচারণার লক্ষ্য ছিল জনগণের মনোযোগ সরিয়ে আনা—জুলাই বিপ্লব, গণহত্যা, দমন-পীড়নের ইতিহাস ও চলমান রাজনৈতিক উত্তাপ থেকে। আর এই পুরো প্রচারণা নেপথ্য থেকে সংগঠিত করেছে দেশের অন্যতম প্রভাবশালী মিডিয়া হাউজ প্রথম আলো।
অভিযোগ উঠেছে, প্রথম আলো তাদের দীর্ঘদিনের গৃহপালিত সংস্কৃতি বলয়—বিশেষত মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার সংশ্লিষ্ট শিল্পীদের ব্যবহার করেছে এই প্রচারণায়। যেসব তারকা এই দিনে শেখ মুজিবুর রহমানকে শ্রদ্ধা জানিয়ে পোস্ট দিয়েছেন, তাদের অনেকেই নিয়মিত প্রথম আলোর পুরস্কারপ্রাপ্ত, কোনো না কোনোভাবে প্রথম আলোর আয়োজনে সম্পৃক্ত বা সম্পূর্ণ নির্ভরশীল।
পোস্টদাতাদের মধ্যে ছিলেন—শাকিব খান, জয়া আহসান, নাজিফা তুষি, পিয়া জান্নাতুল, আরশ খান, কোনাল, লিংকন ডি কস্তা (আর্টসেল), ইরফান সাজ্জাদ, খায়রুল বাশার, তারিন, সাজু খাদেম, অরুণা বিশ্বাস, তমালিকা কর্মকার, শামীমা তুষ্টি, শরাফ আহমেদ প্রমুখ।
তাদের পোস্টের ভাষা, শৈলী এবং টাইমিং ছিল অভিন্ন ও সাংগঠনিকভাবে সমন্বিত—যা স্বতঃস্ফূর্ত নয় বলেই মনে করেন অনেকে।
নেপথ্যে কে ছিলেন? একজন যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী, আওয়ামী ঘনিষ্ঠ এবং প্রথম আলো সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক এই প্রচারণার মূল সংগঠক বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিনোদন অঙ্গনে তার প্রভাব এবং স্ত্রী একজন পরিচিত সংগীতশিল্পী হওয়ায়, এই সাংবাদিক দীর্ঘদিন ধরে সাংস্কৃতিক বলয়ে শক্ত অবস্থান তৈরি করে রেখেছেন। তিনিই মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কারের অন্যতম নেপথ্য কারিগর এবং তার হাত ধরেই গড়ে উঠেছে একটি ‘সাংস্কৃতিক সিন্ডিকেট’, যারা প্রথম আলোর প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য প্রকাশ করে থাকে।
এই সিন্ডিকেটের মধ্য দিয়ে একটি ‘সাংস্কৃতিক আগ্রাসন’ পরিচালনা করছে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার ঘরানার গোষ্ঠী। বিশেষত ভারতীয় সংস্কৃতি অনুকরণ, আওয়ামী আদর্শের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা এবং মুক্তচিন্তার নামে নির্দিষ্ট মতবাদ চাপিয়ে দেওয়ার অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের।
সাংস্কৃতিক রাজনীতিতে পুনঃপুনর্বাসনের চেষ্টার ইঙ্গিত? জুলাই বিপ্লবের সময় দেশের বহু সাংস্কৃতিক কর্মী রাজপথে নেমেছিলেন। তারা আওয়ামী দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছিলেন। প্রথম আলোর ঘরানার অনেক শিল্পীও সেই সময় ‘গণতন্ত্রের পক্ষে’ অবস্থান নেন। কিন্তু বর্তমানে তাদের অবস্থান পাল্টেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রথম আলো এক বছরের মধ্যেই এই সংস্কৃতি বলয়কে পুনঃসংগঠিত করে আওয়ামী সংস্কৃতির পুনর্বাসনের প্রকল্পে কাজে লাগাচ্ছে।
সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ১৫ আগস্টের এই ‘শ্রদ্ধা প্রচারণা’ ছিল সেই বৃহৎ প্রকল্পের অংশ, যার উদ্দেশ্য হলো—শেখ মুজিবুর রহমানকে শুধুমাত্র একজন ‘জাতির পিতা’ হিসেবে চিত্রিত করা, তার শাসনামলের বিতর্কিত অধ্যায় যেমন একদলীয় শাসন, রক্ষীবাহিনীর দমন, ৭৪-এর দুর্ভিক্ষ ইত্যাদি চেপে যাওয়া, এবং তার ভাবমূর্তিকে ‘অরাজনৈতিক’ আবরণে পুনঃস্থাপন করা।
প্রথম আলো: ফ্যাসিবাদের সাংস্কৃতিক মুখ? প্রথম আলোর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই একটি অভিযোগ রয়েছে—তারা মূলত ‘নরম ফ্যাসিবাদ’ চর্চা করে। অর্থাৎ সরাসরি সরকারের পক্ষে অবস্থান না নিয়েও সরকারের ফ্যাসিবাদী ন্যারেটিভকে সাংস্কৃতিক, সাহিত্যিক এবং তথাকথিত ‘সুশীল’ ভাষায় প্রতিষ্ঠা করে। মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার সেই কৌশলের। যারা তাদের অনুগত, তারা পায় পুরস্কার, কাভারেজ, অনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি; যারা ভিন্নমত পোষণ করেন, তাদের জায়গা নেই।
একই সুরে সবার পোস্ট: কাকতালীয় নাকি পরিকল্পিত? সাংবাদিকতা, গণমাধ্যম এবং সংস্কৃতি সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, ১৫ আগস্ট যেসব শিল্পী-সেলিব্রেটি একযোগে পোস্ট দিয়েছেন, তারা সবাই প্রথম আলোর ঘরানার সুবিধাভোগী। পোস্টগুলো ছিল প্রায় একই ধরনের—‘শোক’, ‘শ্রদ্ধা’, ‘চিরস্মরণীয়’—এই শব্দগুলো পুনঃপুনঃ ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু এসব পোস্টে শেখ মুজিবের শাসনকালীন বাস্তবতা, একনায়কতন্ত্র, সেন্সরশিপ, দুর্ভিক্ষ, রক্ষীবাহিনীর দমন-পীড়নের প্রসঙ্গ ছিল না।
গণতন্ত্রের ছদ্মবেশে নতুন ফ্যাসিবাদের পদধ্বনি? প্রথম আলো যেভাবে আবার সাংস্কৃতিক বলয়কে সক্রিয় করেছে, এতে মনে করা হচ্ছে—তারা ২০২৫ পরবর্তী প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে নতুন এক ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার কৌশলে এগোচ্ছে।
১৫ আগস্ট ২০২৫-এর প্রচার-প্রচারণা নিয়ে যে প্রশ্নগুলো উঠেছে, তা নিছক বিতর্ক নয়—বরং বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক চেতনার ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগের ইঙ্গিত দেয়। একটি মিডিয়া গোষ্ঠী যদি রাজনৈতিক পুনর্বাসনের এমন মনস্তাত্ত্বিক প্রকল্পে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে সেটি গণতন্ত্র, সংস্কৃতি এবং জনগণের স্বাধীন চেতনার জন্য কতটা হুমকি, তা এখন সময়ের মুখোমুখি এক কঠিন প্রশ্ন।