1. dailyainerkantho@gmail.com : admin :
  2. abedali4249@gmail.com : dailydeshkantha :
  3. zaharuliofficial@gmail.com : Zaharul Islam : Zaharul Islam
ভোলাগঞ্জের পাথর লুট: সাদা পাথরে পড়েছে সর্বদলীয় কালো হাত - dailydeshkantha
৩০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ| ১৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ| গ্রীষ্মকাল| বৃহস্পতিবার| রাত ৯:৩৭|

ভোলাগঞ্জের পাথর লুট: সাদা পাথরে পড়েছে সর্বদলীয় কালো হাত

Reporter Name
  • Update Time : মঙ্গলবার, আগস্ট ১৯, ২০২৫,
  • 390 Time View
ভোলাগঞ্জের পাথর লুট: সাদা পাথরে পড়েছে সর্বদলীয় কালো হাত
ভোলাগঞ্জের পাথর লুট: সাদা পাথরে পড়েছে সর্বদলীয় কালো হাত

সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জে বিখ্যাত ‘সাদা পাথর’ এখন শুধুই স্মৃতি। সৌন্দর্য, সম্ভাবনা আর পর্যটনের প্রতীক হয়ে ওঠা এই পাথরশালার এখন দৃশ্যপটে আছে শুধু গর্ত, ধুলা আর লজ্জা। চার মাসের ব্যবধানে দিনে-দুপুরে প্রকাশ্যে লোপাট হয়েছে প্রায় ৮০ শতাংশ সাদা পাথর। প্রশাসনের সামনে, ক্যামেরার সামনে, জনগণের চোখের সামনেই এই লুটপাট চলে গেছে কোনো জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে।

 

এই ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতির এক বিরল ও বেদনাদায়ক অধ্যায়কে সামনে নিয়ে এসেছে—সর্বদলীয় লুটের ঐকমত্য।

সাদা পাথর: বিস্ময় থেকে বিপর্যয় ভোলাগঞ্জের সাদা পাথর ছিল শুধু একটি ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য নয়, ছিল এক অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও পর্যটনের কেন্দ্রবিন্দু। ভারতের পাহাড়ি ঢলের তোড়ে শত শত বছর ধরে গঠিত এই পাথরের প্রাকৃতিক শয্যা নতুন করে দৃশ্যমান হয়েছিল ২০১৭ সালের প্রবল ঢলের পর। স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারি, পর্যটন উন্নয়ন, গণমাধ্যম প্রচার—সব মিলিয়ে এটি হয়ে ওঠে উত্তর-পূর্ব বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থান।

কিন্তু সেই সৌন্দর্য আজ শূন্যতায় বিলীন। নদীর গহ্বর থেকে উঠে এসেছে প্রমাণ—দেশের রাজনীতি ও প্রশাসন যখন হাত মেলায়, তখন প্রকৃতি কেবল ক্ষতবিক্ষতই হয় না, লুট হয়ে যায় নিঃশেষে।

 

পাথর নয়, এটি ছিল ‘ঐকমত্যের রাজনৈতিক শিল্পকলা’

এই ঘটনা নিছক অপরাধ বা ব্যবসায়িক লোভ নয়, বরং একটি সূক্ষ্ম রাজনৈতিক ঐকমত্যের বহিঃপ্রকাশ—এমনটাই বলছেন পর্যবেক্ষকরা। ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক কর্মী, প্রশাসন ও ব্যবসায়ী—সবাই এক কাতারে দাঁড়িয়ে একটি কাণ্ড ঘটিয়েছেন—ভোলাগঞ্জের সাদা পাথরকে অর্থে পরিণত করা।

সরকার যখন অবশেষে ‘না’ বলল, তখন শুরু হলো গণলুট। একে বলা হচ্ছে ‘সর্বদলীয় ডাকাতি’র অভাবনীয় নিদর্শন। প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা, আদালতের আদেশ উপেক্ষা করে হাজারো শ্রমিককে নামিয়ে দেওয়া হয় নদীতে। কেউ বাধা দেয়নি, কেউ জবাব দেয়নি।

 

আইন ও বাস্তবতার চরম ব্যবধান

প্রকৃতি সংরক্ষণে বাংলাদেশের আইন যথেষ্ট শক্তিশালী—পরিবেশ আইন, খনিজ সম্পদ আইন, ইসিএ ঘোষণাসহ নানা বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। প্রশাসনের অভিযান হয়েছে, বিদ্যুৎ সংযোগ কাটা হয়েছে, কিছু জায়গায় পাথর ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে, মামলাও হয়েছে ১৯টি, গ্রেপ্তার মাত্র ৬০ জন। অথচ এক বছরে লোপাট হওয়া পাথরের পরিমাণ প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট, বাজারমূল্য ২০০ কোটি টাকারও বেশি।

এই বিপুল লুটের পেছনের মূল চক্র রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। পরিবেশ অধিদপ্তরের করা মামলায় আসামি সহস্রাধিক, কিন্তু বিচারিক প্রক্রিয়ায় অগ্রগতি সামান্যই। এতে প্রতীয়মান হয়, রাষ্ট্র আইনের প্রয়োগে দুর্বল, ক্ষমতার চাপে আপোষে অভ্যস্ত।

 

পর্যটনের ধস, জীবিকার সংকট

পাথর হারানোর পরপরই ধসে পড়ে পর্যটনখাত। আগে যেখানে প্রতিদিন হাজারো পর্যটক ভিড় করত, আজ সেখানে পড়ে আছে নিঃস্তব্ধতা। ঘোড়াচালক হাসান মিয়ার মতো অনেকেই যারা পর্যটনের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করতেন, তারা আজ আয়হীন। দোকানি, গাইড, ফটোগ্রাফারদের আয় প্রায় ৭০% কমে গেছে।

পর্যটন একসঙ্গে সৌন্দর্য, সংস্কৃতি ও স্থানীয় অর্থনীতির সেতুবন্ধ। সেটিকে ধ্বংস করে যে সাময়িক লভ্যাংশ অর্জন করা হয়েছে, তা আসলে দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনার অপচয়।

 

কীভাবে চলে এই ‘পাথর অর্থনীতি’?

ভোলাগঞ্জে গড়ে উঠেছে একটি বিস্তৃত অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি। শ্রমিক পায় দৈনিক ৩০০–৪০০ টাকা, তার মধ্যে দালাল, নৌকাভাড়া ও খাজনার ভাগ কেটে যায়। নৌকার মালিক পায় রাজনৈতিক আশীর্বাদ, ট্রাক মালিকের সঙ্গে থানার সম্পর্ক, জমির মালিক ‘দলের লোক’, আর শেষ বিক্রেতা ক্রাশার মালিকের পেছনে থাকে প্রশাসনের ছায়া। বিদ্যুৎ বিভাগ, ব্যবসায়ী সমিতি ও রাজনৈতিক নেতারা মিলে তৈরি করেছেন ‘স্থিতিশীলতা’—যেখানে প্রশাসন কার্যত দর্শকের ভূমিকায়।

 

কেবল ‘ক্ষুধা’র অজুহাতে প্রকৃতি লুণ্ঠন নয়

পাথরখেকোদের সবচেয়ে প্রিয় অজুহাত—‘পেটের ক্ষুধা’। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—ক্ষুধার চিকিৎসা কি ডাকাতি হতে পারে? রাষ্ট্র চাইলে সহজেই বিকল্প কর্মসংস্থান, পুনর্বাসন, প্রশিক্ষণ ও স্বীকৃত শ্রমিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারে। কিন্তু সেটি করা হয়নি।

এই ‘ক্ষুধা’ ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রকৃতির ওপর এক দমননীতির। রাজনীতির সব দলের সম্মিলিত নীরবতা এটাই প্রমাণ করে—লুটে তাদের সমস্যা নেই, সমস্যা ছিল নিয়ন্ত্রণ হারানোতে।

 

নিষ্ক্রিয়তার সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক দায়

সরকারি তদন্ত চলছে, দুর্নীতি দমন কমিশন মাঠে, অভিযান অব্যাহত। তবে এখনই না থামালে ইতিহাসের দায় এড়ানো সম্ভব হবে না। কেবল এক দলের ওপর দায় চাপিয়ে পার পাওয়া যাবে না। যেসব দলের নেতারা জড়িত, তাদের নাম, ভূমিকা ও অবস্থান প্রকাশ্যে আনতে হবে। একদল শাস্তি পেলে, আরেক দল রেহাই পেলে বিচার থাকবে অসম্পূর্ণ।

ধিক্কার তাদের, যারা দায়ীদের রক্ষায় কৌশলী। সাধুবাদ তাদের, যারা স্বচ্ছতার পক্ষে দাঁড়িয়েছে। জনগণের ওপর নির্ভর করে রাজনীতি হয়, অথচ এই ঘটনার পর রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা ছিল নীরবতা আর সুবিধাভোগের প্রতিযোগিতা।

 

সম্ভব একটি সমাধানের ছক

ভোলাগঞ্জের ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিচের পদক্ষেপগুলো জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা:

রিয়াল-টাইম নজরদারি: ড্রোন, স্যাটেলাইট, জিপিএস এবং ওয়েটব্রিজ ডেটার মাধ্যমে।

স্থায়ী বাজেয়াপ্তকরণ: অপরাধে ব্যবহৃত ট্রাক, নৌকা, ক্রাশার স্থায়ীভাবে বাজেয়াপ্ত করতে হবে।

স্বচ্ছ কেস ম্যানেজমেন্ট: অনলাইন ট্র্যাকিং, নির্ধারিত সময়সীমা ও দায়ী কর্মকর্তার নাম প্রকাশ।

প্রাকৃতিক পুনঃস্থাপন: নদী পুনর্বাসনের জন্য সেডিমেন্ট ট্র্যাপ, ইকোলজিক্যাল স্ট্যাবিলাইজেশন।

বিকল্প জীবিকা: স্থানীয় শ্রমিকদের জন্য টেকসই প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ।

রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা: পাথর লুটে জড়িত রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নাম প্রকাশ ও শাস্তি নিশ্চিত।

 

এই ঘটনা শুধুই একটি নদীর লুট নয়, রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি

ভোলাগঞ্জে যা ঘটেছে, তা কেবল একটি স্থানীয় দুর্নীতি নয়, এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রচরিত্র, রাজনৈতিক অসারতা এবং নৈতিক দৈন্যের এক নগ্ন প্রতিচ্ছবি। প্রশ্ন এখন শুধু পাথরের নয়, প্রশ্ন দেশের—আমরা কি বদলাতে চাই, নাকি কেবল বিস্মৃত হতে চাই?

সাদা পাথর আজ নেই। কিন্তু এই ঘটনায় লেখা হয়েছে এক কঠিন ইতিহাস। আমরা চাইলে এখান থেকেই শুরু করতে পারি সত্যিকারের পরিবর্তনের গল্প। নয়তো ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ইতিহাস বইয়ে শুধু একটিই বাক্য পাবে—”এখানেই বাংলাদেশ মুখ ঢেকে নিয়েছিল।”

রিপোর্ট: বিশেষ প্রতিনিধি ।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © 2025                                    Themes Create by BDITWork