সৌদি আরবের জেদ্দায় লোহিত সাগরের তীরে দাঁড়িয়ে আছে এক অনন্য স্থাপত্যশিল্পের নিদর্শন—আর-রাহমাহ মসজিদ। স্থানীয়ভাবে এটি ফাতেমাতুজ জাহরা মসজিদ নামেও পরিচিত। ১৯৮৫ সালে নির্মিত হওয়ার পর থেকেই এটি সারা বিশ্বে “ভাসমান মসজিদ” হিসেবে খ্যাতি পেয়েছে। বলা হয়, সমুদ্রের বুকে নির্মিত এ মসজিদই প্রথম ভাসমান মসজিদ হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
প্রায় ২,৪০০ বর্গমিটার আয়তনের এই মসজিদ যেন দূর থেকে একটি সমুদ্রে ভাসমান জাহাজ। এর আকাশছোঁয়া সাদা মিনার এবং নীলাভ গম্বুজ দর্শনার্থীদের দৃষ্টি কাড়ে। বড় গম্বুজটির চারপাশে রয়েছে ৫২টি ছোট গম্বুজ এবং বাইরের দিকে আরও ২৩টি ছোট গম্বুজ। বছরের বেশিরভাগ সময় মসজিদের স্তম্ভগুলো পানির নিচে ডুবে থাকে, যা একে সত্যিকার অর্থেই সমুদ্রে ভাসমান বলে মনে হয়।
মসজিদটিতে একসঙ্গে প্রায় ২,৩০০ মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। নারীদের জন্যও রয়েছে বিশেষ নামাজের স্থান। ভেতরের কাঠের ঝুলন্ত অংশে একসঙ্গে ৫০০ নারী নামাজ আদায় করতে পারেন। স্থাপত্যে আধুনিক প্রকৌশল ও ইসলামি শিল্পকলার চমৎকার সমন্বয় ঘটেছে। দেয়ালে খোদাই করা হয়েছে পবিত্র কোরআনের আয়াত ও হাদিসের শৈল্পিক নিদর্শন।
এ মসজিদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো প্রযুক্তির ব্যবহার। ভেতরে বসানো হয়েছে অত্যাধুনিক স্ক্রিন, যার মাধ্যমে জুমার খুতবা বা অন্য ভাষণ সরাসরি অনুবাদ হয়ে শোনা যায়। বিদেশি মুসল্লিদের জন্য এটি বিশেষভাবে সুবিধাজনক।
বিশ্বজুড়ে মুসলিম ভ্রমণকারীদের কাছে এটি এক আকর্ষণীয় গন্তব্য। বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, তুরস্কসহ পশ্চিম এশিয়ার পর্যটকরা এখানে বেশি আসেন। হজ ও উমরাহ পালন শেষে অনেকে জেদ্দা ঘুরতে গিয়ে মসজিদটি পরিদর্শন করেন। মক্কা বা মদিনা থেকেও অনেক মানুষ শুধু এ মসজিদ দেখার জন্যই জেদ্দায় আসেন। সমুদ্রের কোলে বসে নামাজ পড়া ও প্রার্থনার পাশাপাশি পর্যটকেরা উপভোগ করেন লোহিত সাগরের মনোরম দৃশ্য।
মসজিদটি নিয়ে সৌদি সোসাইটি ফর সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সদস্য এবং কিং আবদুল আজিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশলী হাদি ইবনে আহমদ জাফারি জানান, সমুদ্রের শেওলা বা লবণাক্ত পানি এ মসজিদের অবকাঠামোয় কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না। কারণ নির্মাণকালে সমুদ্রের লবণাক্ততা, স্রোতের গতি ও আবহাওয়ার সব বিষয় বিবেচনা করে বিশেষ উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে প্রায় চার দশক ধরে এটি সমুদ্রের ঢেউয়ের মাঝেই অটল দাঁড়িয়ে আছে।
সমুদ্রের বুকে এমন ভাসমান সৌন্দর্যের জন্য আর-রাহমাহ মসজিদকে শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, বরং স্থাপত্যশিল্প ও প্রকৌশলের এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়। জেদ্দার অন্যতম পরিচিত নিদর্শন এই মসজিদ প্রতি বছর লাখো দর্শনার্থীকে আকৃষ্ট করছে।