২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নাটকীয় পরিবর্তন আসে। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আওয়ামী লীগ ও এর ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলো প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়। অনেক শীর্ষ নেতা দেশ ছাড়েন, কেউ গ্রেপ্তার হন, আবার কেউ আত্মগোপনে চলে যান। প্রায় কয়েক মাস কার্যক্রম স্থবির থাকলেও চলতি বছরের শুরু থেকে দলটি নতুন কৌশলে মাঠে নামতে শুরু করেছে। হঠাৎ করেই মিছিল, আবার দ্রুত সরে পড়া—এ কৌশল এখন ‘ঝটিকা মিছিল’ নামে পরিচিতি পেয়েছে।
রাজধানী ঢাকায় একের পর এক এমন মিছিল নিয়ে জনমনে ও রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। আদালতের রায়ে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ হলেও, দিনের আলোতে শত শত নেতাকর্মীর মিছিল করার সুযোগ কীভাবে মিলছে? রাজধানীতে সেনা, পুলিশ, র্যাবসহ প্রায় সব বাহিনী মোতায়েন থাকা সত্ত্বেও নিষিদ্ধ দলটি কীভাবে প্রকাশ্যে কর্মসূচি চালাচ্ছে—এ প্রশ্নও উঠছে।
প্রথম দিকে ভোর রাতে অল্পসংখ্যক কর্মীর অংশগ্রহণ থাকলেও বর্তমানে শত শত নেতাকর্মীকে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে মিছিল করতে দেখা যাচ্ছে। ২৪ অক্টোবর ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে ছাত্রলীগের মিছিল থেকে শুরু করে ১২ নভেম্বর মানিক মিয়া এভিনিউ, ৬ এপ্রিল গুলিস্তান, ১৮ এপ্রিল উত্তরায় বিক্ষোভ—একই ধারাবাহিকতায় আগস্ট-সেপ্টেম্বরেও একাধিক এলাকায় ঝটিকা মিছিল হয়েছে। ব্যানার, মোটরসাইকেল বহর নিয়েও এসব মিছিল হচ্ছে।
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, ঢাকার বাইরে থেকে নেতাকর্মী এনে এসব মিছিল করা হচ্ছে, যাতে স্থানীয়রা সহজে তাদের চিনতে না পারেন। এর নির্দেশনা ও অর্থায়ন বিদেশে থাকা নেতাদের কাছ থেকে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে আসছে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রধান মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, বিদেশে থাকা নেতারা হোয়াটসঅ্যাপে একাধিক গ্রুপ চালাচ্ছেন, যেখান থেকে নির্দেশনা ও অর্থ পাঠানো হচ্ছে। তিনি জানান, গোয়েন্দা নজরদারি ও গ্রেপ্তার অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং প্রয়োজনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) দাবি, বিশাল ঢাকায় সীমিত জনবল দিয়ে প্রতিটি জায়গায় মিছিল আটকানো সম্ভব নয়। ডিএমপির মিডিয়া বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, নিয়মিত গ্রেপ্তার অভিযান চলছে, টহল ও নজরদারিও অব্যাহত রয়েছে।
গত ৮ সেপ্টেম্বর সেনানিবাসে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে মিলিটারি অপারেশনস ডিরেক্টরেটের কর্নেল মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ঝটিকা মিছিলের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।
অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করেন, ঝটিকা মিছিলকে শুধু শক্তি দিয়ে দমন করা সম্ভব নয়। নিরাপত্তা ও অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, “আওয়ামী লীগের অসংখ্য ভোটার ও সমর্থক এখনো দেশে আছেন। তাদের অস্তিত্ব বিলীন হয়নি। সময় ও সুযোগ বুঝে তারা সংগঠিত হবে—এটাই স্বাভাবিক। এটি রাজনৈতিক সমস্যা, তাই রাজনৈতিক সমাধানই জরুরি।”