1. dailyainerkantho@gmail.com : admin :
  2. abedali4249@gmail.com : dailydeshkantha :
  3. zaharuliofficial@gmail.com : Zaharul Islam : Zaharul Islam
রাজনীতির নতুন গতিপথ শিবিরের ভূমিধস বিজয় - dailydeshkantha
৮ই ডিসেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ| ২৩শে অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ| হেমন্তকাল| সোমবার| রাত ১২:২২|
শিরোনামঃ
ঢাকা-৫ আসনে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) থেকে মোহাম্মদ নূরে আলম মিয়াজীর প্রার্থিতা ঘোষণা মায়ের জন্য ব্যাকুলতা: এক অমলিন অনুভূতির প্রতিচ্ছবি লিও ডেতে নেপালে বাংলাদেশি প্রতিনিধিদলের বিশেষ উপস্থিতি: আন্তর্জাতিক বন্ধন আরও দৃঢ় বড়াইগ্রাম-গুরুদাসপুরে জামায়াত প্রার্থীর পোস্টার ছেঁড়ার অভিযোগ আজ আসছে না এয়ার অ্যাম্বুলেন্স, খালেদা জিয়ার লন্ডন যাত্রা পেছাল ব্রাকসু স্থগিতে ক্ষোভে ফুঁসছে বেরোবি ৮ থেকে ১২ ফেব্রুয়ারির মধ্যে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট রণবীরের ‘ধুরন্ধর’ লুক দেখে যা বললেন দীপিকা বিশ্বকাপে অজানা নম্বর থেকে ফোনের ঢল যেভাবে সামলেছেন জেমাইমা সিরিয়ায় ‘হস্তক্ষেপ’ না করতে ইসরায়েলকে ট্রাম্পের সতর্কতা

রাজনীতির নতুন গতিপথ শিবিরের ভূমিধস বিজয়

Reporter Name
  • Update Time : সোমবার, নভেম্বর ৩, ২০২৫,
  • 59 Time View
রাজনীতির নতুন গতিপথ শিবিরের ভূমিধস বিজয়
রাজনীতির নতুন গতিপথ শিবিরের ভূমিধস বিজয়

ডা. মোহাম্মদ নাঈম
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভোটকেন্দ্রগুলোতে ভোটারদের দীর্ঘ লাইন। কখনো এতটা উৎসবমুখর দেখা যায়নি ঢাবি ক্যাম্পাস। ভোটারদের চোখে-মুখে উচ্ছ্বাস, আনন্দ! কেন্দ্র ঘুরে ঘুরে হতবাক সাংবাদিকেরা। সবার মুখে একটা নাম, ‘সাদিক কায়েম!’

সাংবাদিকদের মতে, সকালেই বোঝা যাচ্ছিল ভিপি হতে যাচ্ছে সাদিক কায়েম! ব্যবধান কত হবে, নিকটবর্তী প্রতিদ্বন্দ্বী কে হবে, এখন সেটাই প্রশ্ন। সাদিক কায়েমকে দেখা ভোটারদের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস আর ছবি তোলার হিড়িক। প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে হয়তো সকালে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল ভোটারদের বার্তা।

মেজাজ হারাতে শুরু করলেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা। বেলা ১২টা না বাজতেই টিএসসি কেন্দ্রে তৈরি হলো মহিলা সহকারী প্রক্টরের সাথে ছাত্রদলের প্রার্থীদের এক তীব্র বাকযুদ্ধ। ভোটের প্যাটার্ন হয়তো আরও ঘুরে গেল। প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদল প্রার্থীদের চোখে-মুখে পরাজয়ের আতঙ্ক আরও প্রবল হয়ে উঠল। একের পর এক ভৌতিক অভিযোগ আর অস্বাভাবিক আচরণ সাংবাদিকসহ দর্শকদের মনেও প্রশ্ন জাগাতে লাগল। ছোট্ট একটা ক্যাম্পাস। হাজার হাজার সাংবাদিক, পরিদর্শক, ক্যামেরা, সিসিটিভি ফুটেজ। এত কিছুর মাঝে ভোটে কারচুপি অসম্ভব। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা একের পর এক ভৌতিক অভিযোগ করতে লাগল। ভোট গ্রহণ গড়াতে থাকল সমাপ্তির দিকে। ডিজিটাল মিডিয়ায় ভেসে উঠল আবিদুলের বিমর্ষ চেহারাসহ সাক্ষাৎকার, “অবস্থা সুবিধার মনে হচ্ছে না।”

 

সুষ্ঠুভাবেই ভোট গ্রহণ শেষ হলো। জানানো হলো–ভোটের হার প্রায় ৮০%। শুরু হলো গণনা। সাথে বাড়তে থাকল উত্তেজনা। ভোট শেষ হওয়া মাত্রই ছাত্রদলের পক্ষ থেকে শুরু হলো ভোট বাতিলের দাবিতে মিছিল। ভিসির সাথে শত শত মিডিয়ার সামনে গণেশ চন্দ্রের টেবিল চাপড়িয়ে গালাগালি উত্তেজনার পারদ আরও বাড়িয়ে দিলো। শুরু হলো ভিসির ওপর চাপ প্রয়োগ করে ভোটের ফলাফল পরিবর্তনের প্রচেষ্টা। বিভিন্ন মহল নড়েচড়ে বসল। বাতাসে ভাসতে থাকল বিভিন্ন ষড়যন্ত্র তত্ত্ব। জামায়াতের দায়িত্বশীলদের কাছে ফোন গেল পদ ভাগাভাগির। জামায়াতের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হলো, ভোটারদের ম্যান্ডেটই ফলাফল। আমরা যদি সব পদে হেরেও যাই, তবুও শিক্ষার্থীদের রায়ই যেন প্রতিফলিত হয়। কোনো ভাগাভাগি চলবে না। শিক্ষার্থীদের ম্যান্ডেট কাটাছেঁড়া চলবে না।

সকাল থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশমুখে ছিল উৎসুক মানুষের উপচে পড়া ভিড়। বেশির ভাগই বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মী, সাথে কিছু উৎসুক মানুষ। কিন্তু সন্ধ্যা হতেই পরিস্থিতি পাল্টাতে লাগল। একদিকে কাটাবন, নীলক্ষেত, শাহবাগে বিএনপির উপস্থিতি বাড়তে লাগল। অন্যদিকে নয়াপল্টনে বিএনপি নেতা নয়নের হুংকার আসতে লাগল, “জামায়াত শিবির রাজাকার, এই মুহূর্তে বাংলা ছাড়!” সাথে বাড়তে থাকল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি। সরকারের তরফ থেকে জামায়াত-বিএনপি দুই পক্ষের সাথেই শান্তি বজায় রাখতে যোগাযোগ করা হলো।

সারা দেশের সতেরো কোটি মানুষের চৌত্রিশ কোটি চোখ ডাকসুর ফলাফলের অপেক্ষায়। কিন্তু শুরু হলো ফলাফল দিতে দীর্ঘসূত্রিতা আর নাটকীয়তা। সময় গড়াল মধ্যরাতে। সারাদিন ‘নির্বাচনে কারচুপি হচ্ছে’ বলা একটা দলের অ্যাক্টিভিস্টরা ফেসবুকে প্রকাশ করা শুরু করল বিভিন্ন কেন্দ্রের ফলাফল, যেখানে প্রায় জিতে যাচ্ছে আবিদুল। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে জানানো হলো–‘এখনো গণনা শেষ হয়নি, সবাই ধৈর্য ধরুন।’ সারা দেশে জাতীয় নির্বাচনের আমেজ। আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা শেষ কবে একটা ইলেকশনের ফলাফলের জন্য এভাবে উদগ্রীব ছিল, আমাদের প্রজন্ম দেখেনি। অবশেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। একের পর এক কেন্দ্রের ফলাফল আসা শুরু করল। পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকল শিবির প্যানেলের সাথে বাকিদের ভোটের ব্যবধান। এ এক ঐতিহাসিক ভূমিধস বিজয়!

ভোটের ফলাফল প্রকাশের সময় মেয়েদের হলগুলোতে সাদিক কায়েমের ভোটের সংখ্যা শুনে দেখা গেল মেয়েদের বাঁধভাঙা উল্লাস। জনাকীর্ণ সিনেট ভবন। কেন্দ্রের সামনে সামনে ফলাফল ঘোষণার সাথে সাথে ভোটারদের উল্লাস। সারা দেশের অজপাড়াগাঁয়ের প্রতিটি ঘরে পৌঁছে গিয়েছিল ডাকসুর আমেজ। ঢাবির প্রবেশমুখগুলো ফাঁকা করে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছিলেন বিএনপির সমর্থকেরা। অন্যদিকে অশ্রুসিক্ত নয়নে শাহবাগ চত্বরে সেজদায় লুটিয়ে পড়তে দেখা গেল শিবির প্যানেল সমর্থকদের। সারাদিন রোজা রাখা ক্লান্ত-শ্রান্ত আবাল-বৃদ্ধ-বনিতারা সারা দেশে আল্লাহর শুকরিয়া জানিয়ে দু-হাত তুলল। সারা দেশকে নাড়া দিলো ডাকসু ফলাফল। এরপরই জাকসু এলো। ডাকসুর ঢেউয়ে জাকসুতেও এলো এক ঐতিহাসিক বিজয়। শত ষড়যন্ত্রের মাঝেও ভিপি বাদে প্রায় সকল পদে শিবিরের এ বিজয় এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হয়ে থাকবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে।

ডাকসু নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, ডিপ স্টেট, সিভিল সোসাইটি, প্রশাসন, ব্যবসায়ী মহল ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো নড়েচড়ে বসে। এ ফলাফল তাদেরকে বাংলাদেশের আগামীর রাজনীতি নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। বিশেষত, আগামী জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতকে কখনো দশটা, কখনো পাঁচটা আসন পাবে বলে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা মহলটি হতবাক হয়ে যায়।

এই ফলাফলকে আমরা বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করতে পারি। ছাত্রশিবিরের জন্য এ ফলাফল ঐতিহাসিক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তথাকথিত পরিবেশ পরিষদ তৈরি করে ছাত্রশিবিরের রাজনীতি একরকম নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বঙ্গভঙ্গের পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল পূর্ববাংলার গরিব মুসলমান কৃষকের সন্তানদের শিক্ষিত করার উদ্দেশ্যে। নবাব সলিমুল্লাহসহ তৎকালীন ধনাঢ্য মুসলিমদের অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার যাত্রা সুখকর ছিল না। কলকাতার বর্ণবাদী হিন্দুদের একাংশ প্রবল বিরোধিতা করেছিল।

সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে সিনিয়র মাদরাসা বলে কটাক্ষ করা হতো। মাদরাসা শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন পড়ার সুযোগ পায়, এজন্য প্রগতিশীল নামক একটি পক্ষের তরফ থেকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা হতো। ইফতার প্রোগ্রামে বাধা প্রদান, কুরআন শিক্ষা প্রোগ্রামে বাধা প্রদান, হিজাব-নিকাব নিয়ে হেনস্তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খুবই সাধারণ ঘটনা ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবির করার কারণে মেরে ফেলার জন্য চার তলা থেকে ফেলে দেওয়া, পিটিয়ে মেরে পুলিশে দেওয়া খুবই সাধারণ ব্যাপার ছিল বছরের পর বছর। এমনকি কাউকে মেরে ফেলতে চাইলে শিবির ট্যাগ দিলেই সারা দেশের কেউ আর প্রতিবাদ করত না।

নির্বাচনের কয়েক দিন আগেও দম্ভভরে এক পক্ষ থেকে বলা হতো–ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইসলাম নামধারী রাজনীতিকে ছুড়ে ফেলে দেবে। শিবির ব্যাপক ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র আব্দুল মালেক ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার কারণে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিধস বিজয় শিবিরকে গ্রহণ করার জন্য বাংলাদেশের আপামর ছাত্র-জনতা প্রস্তুত–এই বার্তা দেয়। যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা অতিথি পাখির জীবনের যে মূল্য ছিল, শিবিরের কারো জীবনের সেই মূল্য ছিল না। শিবির করার কারণে পিটিয়ে হত্যা সাধারণ ব্যাপার ছিল। সারা বাংলাদেশের কাছে বামপন্থিদের ঘাঁটি হিসেবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে তুলে ধরা হতো। দীর্ঘদিন ধরে ফ্যাসিবাদী কায়দায় বামপন্থীদল, ছাত্রলীগ, ছাত্রদল মিলে তথাকথিত পরিবেশ পরিষদ গঠন করে নিষিদ্ধ সংগঠন বলার চেষ্টা করেছিল। অথচ, আইনত ইসলামী ছাত্রশিবির কখনোই জাবিতে নিষিদ্ধ ছিল না। সেরকম একটা পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে, ঢাকার দুইটা গুরুত্বপূর্ণ ক্যাম্পাসে ছাত্রশিবিরের ভূমিধস বিজয় বাংলাদেশের মানুষের চিন্তাজগতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। অন্যান্য ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে ফলাফল কী হবে তা সহজেই অনুমেয়।

ছাত্রশিবিরের দাওয়াতি কাজে যেমন গতি আসবে, দলে দলে শিক্ষার্থীরা ছাত্রশিবিরের দিকে ছুটে আসবে। আবার শিবিরের জন্য এ বিজয় অনেক বড় চ্যালেঞ্জও নিয়ে আসবে আগামীতে। এ বিজয় শিবিরবিরোধী সকল শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে শিবিরের বিরুদ্ধে নামাবে সামনের দিনগুলোতে। আধিপত্যবাদী শক্তিগুলো ছাত্রশিবিরকে ধ্বংসের জন্য তাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করবে। ছাত্রশিবিরের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিশেষত অনলাইন মিডিয়ার যুগে নিজেদের জনশক্তি ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের ফেসবুক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা। শিবিরের শুভাকাঙ্ক্ষী বা সমর্থক কেউ অন্য কাউকে নিয়ে খারাপ মন্তব্য করলেও এই দায় শিবিরকে দেওয়া হবে।

জামায়াতের জন্য এই ফলাফল এক ঐতিহাসিক বার্তা নিয়ে আসে। এই ফলাফল আমাদের আভাস দিচ্ছে–আগামী জাতীয় নির্বাচনে বিগত নির্বাচনের ফলাফলগুলোর পরিসংখ্যান কাজে লাগবে না। দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর ভোট না দেওয়া একটা প্রজন্ম তৈরি হয়েছে। তরুণদের একটা বড় অংশ জামায়াতের দিকেই ঝুঁকবে। সারা দেশের মানুষের মাঝে আগামী নির্বাচনে জামায়াত বিজয়ী হতে পারে, এরকম একটি আশাবাদ তৈরি করেছে। সারা বিশ্বে এখন চলছে ডানপন্থি জয়জয়কার। সে অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ফলাফলের মতো বাংলাদেশের আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল হতে পারে, আমাদের সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, জামায়াত ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ফলাফল কতখানি ঘরে তুলতে পারে। তবে এ নির্বাচনের পরে ব্যবসায়ী মহল, প্রশাসন, সুশীল সমাজ ও জনগণের মাঝে জামায়াত নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে এবং সবাই জামায়াতকে সমীহের চোখে দেখছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা, আগামী জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু করা, নিজেদের কিছু নেতাকর্মীর অতিকথন নিয়ন্ত্রণ করা, আধিপত্যবাদী ও বাংলাদেশবিরোধী শক্তির ষড়যন্ত্র জামায়াতের জন্য চ্যালেঞ্জ।

ছাত্র সংসদ নির্বাচন বিএনপির ফ্যাসিবাদী মানসিকতা আমাদের সামনে তুলে ধরেছে। প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টা জাতীয় নির্বাচন চাওয়া বিএনপি ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলোর বিরোধী ছিল। সে ক্ষেত্রে বিএনপির মানসিকতা হচ্ছে “আমরা নির্বাচন চাই কিন্তু সাথে জেতার নিশ্চয়তাও চাই। জেতার নিশ্চয়তা না থাকলে আমরা নির্বাচনে যাব না, নির্বাচন হতেও দেবো না।” রাকসু এবং চাকসু পেছানোর জন্য ছাত্রদল এবং বিএনপির প্রচেষ্টা সে দিকে ইঙ্গিত করে। আমরা আরও অবাক হয়ে খেয়াল করলাম–একটা ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ফলাফল পাল্টানোর জন্য বিএনপির সর্বোচ্চ মহল থেকে যেভাবে প্রচেষ্টা চালানো হয়, সেটি একই সাথে বিস্ময়কর এবং দুঃখজনক। যে দলের প্রতিষ্ঠাতা বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক, যে দলের নেত্রী গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করে আপোষহীন নেত্রী উপাধি পেয়েছেন; সেই দল জাকসু নির্বাচনে জেতার জন্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের ব্যবহার করার নির্লজ্জ প্রচেষ্টা চালিয়েছে। এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেই বিরল। ঘটনাগুলো বর্তমান বিএনপির মানসিকতা সম্পর্কে আমাদের স্পষ্ট ধারণা দেয়।

সারা দেশে বিএনপির চাঁদাবাজি, লুটপাটসহ নেতিবাচক কর্মকা-গুলোকে এদেশের ছাত্র-জনতা প্রত্যাখ্যান করেছে। সেই পুরোনো দিনের আওয়ামী ন্যারেটিভ নিয়ে বাংলাদেশে রাজনীতি করে খুব বেশি সুবিধা পাওয়া যাবে না–সংসদ নির্বাচন আমাদের এই আভাস দিচ্ছে। বিএনপি’র নেতাকর্মীরা মনে করেছিল–নির্বাচনে এলেই তারা ক্ষমতায় যাবে। সেই আশায় গুড়েবালি পড়তে পারে। বিএনপির সব পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে সেই হতাশা ভর করেছে। পুরোনো দিনের রাজনীতি ছাত্র-জনতা প্রত্যাখ্যান করেছে। এ অবস্থায় দাঁড়িয়ে বিএনপি যদি তার চরিত্র সংশোধন না করে, তাহলে আগামী দিনে বিএনপিকে জাতীয় নির্বাচনে বড়োসড়ো বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হবে। ভারতের আধিপত্যবাদী রাজনীতিকে বাংলাদেশের মানুষ প্রত্যাখ্যান করেছে। ভারতের ন্যারেটিভ নিয়ে ১৫ বছর ধরে এ দেশের মানুষকে শোষণ করা আওয়ামী লীগকে দেশ থেকে তাড়িয়েছে জনতা। সেই একই ভারতীয় রাজনীতি বিএনপি করতে চাইলে জনগণ ভালোভাবে নেবে না।

ভোটের ফলাফল মেনে না নিয়ে বিতর্কিত করার চেষ্টা বিএনপির ও ছাত্রদলের রাজনীতিকে আরও ঝুকিতে ফেলবে। শুধুমাত্র ‘নীলক্ষেতে’ ব্যালট ছাপানো হয়েছে এই অভিযোগে ভোটের ফলাফলকে বিতর্কিত করার প্রচেষ্টা হালে পানি পাবে না। যেখানে নির্বাচন কমিশন সহ প্রায় সব রিটার্নিং অফিসার বিএনপিপন্থী সাদা দলের। ব্যালট-শীটে ভোটারের সাইন, পোলিং অফিসারের সাইন ভোট গণনার সময় মিলানো হয়েছে। ভোটের শুরুতে ব্যালট বক্স খুলে দেখানো থেকে শুরু করে পুরো ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া রেকর্ডেড। সে অবস্থায় ভোটে কারচুপির অভিযোগ ধোপে টিকবে? একটা হাজার চল্লিশেক ভোটারের ডাকসু নির্বাচনে এই যদি হয় আচরণ, জাতীয় নির্বাচনে কী হবে? লক্ষ লক্ষ বুথে কোটি কোটি ভোটারের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি হেরে গেলে কীভাবে মেনে নেবে? হারকে মেনে নিতে পারাও গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে একটা রাজনৈতিক দলের জন্য অনেক বেশি জরুরি।

‘এই সময়’ নামক কলকাতাকেন্দ্রিক একটি অনলাইন পোর্টালে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে। সেই সাক্ষাৎকারে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টিকে আগামী নির্বাচনে চেয়ে এবং বাংলাদেশে ভারতীয় প্রভাব বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিএনপি আমাদের ইঙ্গিত দিচ্ছে–তারা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার আপসহীন রাজনীতি থেকে সরে এসে হাসিনার মতো ভারতের তাঁবেদারির রাজনীতি বেছে নিয়েছে। যদিও বিএনপির পক্ষ থেকে কখনো “এআই দিয়ে তৈরি”, কখনো “এ ধরনের বক্তব্যই দেই নাই” বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সংবাদপত্রটি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সাথে সাক্ষাৎকারগ্রহীতার ছবিসহ প্রকাশ করায় বিএনপির বক্তব্য নিয়ে জনমনে সন্দেহ তৈরি করেছে। জুলাই সনদকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি না দিতে তালবাহানা, বাহাত্তরের সংবিধানকে রক্ষা করতে মরিয়া প্রচেষ্টা, সর্বোপরি সংস্কারের মূল দশটি পয়েন্টে নোট অফ ডিসেন্ট দিয়ে বিএনপি জনমনে অবিশ্বাস তৈরি করেছে। এই অবস্থায় সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিএনপি বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে। বিএনপিকে অবশ্যই শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে ফিরে আসতে হবে এবং পুরোনো নোংরা রাজনীতি পরিহার করে জনগণের পক্ষে, জুলাইয়ের পক্ষে রাজনৈতিক অবস্থান নিতে হবে।

এনসিপির জন্য ছাত্র সংসদ নির্বাচন একটি বড়সড় ধাক্কা। জুলাই অভ্যুত্থানে ছাত্রশিবির, ছাত্রদলসহ আপামর ছাত্র-জনতার অংশগ্রহণ ছিল। কিন্তু আমরা অদ্ভুতভাবে লক্ষ করলাম–আগস্টের পর সকল পক্ষকে মাইনাস করে দিয়ে এনসিপি নিজেদের পক্ষে জুলাই অভ্যুত্থানের সকল কৃতিত্ব দাবি করা শুরু করেছে। জুলাই অভ্যুত্থানে নেট বন্ধ করার পর সমন্বয়ক কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। কেউ হারুনের হোটেলে, কেউ আইনমন্ত্রীর সাথে লিয়াজোঁ করার জন্য চলে গিয়েছিল। সে অবস্থা থেকে ছাত্রশিবির এ আন্দোলনকে টেনে সরকার পতনের দিকে নিয়ে গেল। দুঃখের বিষয়–৫ আগস্টের পর ছাত্র উপদেষ্টারা সাদিক কায়েমদের ফোন ধরা বন্ধ করে দিলো। আব্দুল কাদের ছাত্রশিবিরের সহযোগিতায় ছাত্রশিবিরের লিখে দেওয়া ৯ দফা পাঠ করে ৯ দফার জনক হয়ে গেল। নিজেরই সহযোগীদের প্রতি তার আচরণ সবাইকে বিস্মিত করেছিল। ছাত্র উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া তার জুলাই স্মৃতির বইয়ে ছাত্রশিবিরের অবদান ছোট করে দেখানোর জন্য সাদিক কায়েমকে ছবি থেকে কেটে বাদ দিলো। সাদিক কায়েমদের অবদান ছোট করার জন্য এমন কোনো প্রচেষ্টা নেই, যা আব্দুল কাদের করেনি।

যে ভারতপন্থি রাজনীতি বাংলাদেশের মানুষ প্রত্যাখ্যান করেছে, ক্যাম্পাসগুলোতে এনসিপির ছাত্রসংগঠন বাগছাসকে একই রকম রাজনীতি করতে দেখা যায়। কখনো কখনো বামদের সাথে নিয়ে রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া, মোমবাতি জ্বালানো, আবার কখনো জুলাই অভ্যুত্থানে তাদের সহযোগী ছাত্রশিবিরকে রাজাকার, পাকিস্তানি মন্তব্যে ট্যাগ দেওয়ার রাজনীতিকে ছাত্রসমাজ প্রত্যাখ্যান করেছে। যারা নিজেদেরকে জুলাইয়ের মূল কারিগর বলে দাবি করত, সেই জুলাই অভ্যুত্থানের সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে স্বঘোষিত ৯ দফার ঘোষক আব্দুল কাদের হাজারের চেয়ে একটু বেশি ভোট পাওয়ায় তাদের রাজনীতিকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। তারা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় রাকসু, চাকসুতে তারা ভোটে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থেকেছে। যে এনসিপি নিজেদেরকে অভ্যুত্থানের প্রধান স্টেকহোল্ডার হিসেবে দাবি করে, সেই অভ্যুত্থানের সূতিকাগার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ছাত্রদের মাধ্যমে প্রত্যাখ্যাত হওয়া তাদের রাজনীতির জন্য বড় ধাক্কা।

ক্যাম্পাসে ছাত্রশিবিরকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত করার মাধ্যমে ছাত্রসমাজ মূলত তাদের নেতৃত্ব ছাত্রশিবিরের হাতে তুলে দিয়েছে। ভুল রাজনীতি, কোরামবাজি, ভাইয়া রাজনীতি, দুর্নীতি, অন্যদের হেয় করার মানসিকতা তাদেরকে খাদের কিনারায় নিয়ে এসেছে। এ অবস্থায় দাঁড়িয়ে কখনো বাগছাসের বিলুপ্তি, আবার কখনো এনসিপি-গণঅধিকার পরিষদ একসাথে মিলিয়ে ফেলার আলোচনা তাদের রাজনৈতিক দৈন্যদশা দেশবাসীর সামনে তুলে ধরে। ভাবতে অবাক লাগে–যে ছাত্ররা ৫ আগস্টের পরেও সারা দেশের মানুষের বিপুল সমর্থন পেয়েছিল, যে ছাত্র উপদেষ্টারা জনগণের বিপুল প্রত্যাশা নিয়ে সরকারে গিয়েছিল; আজ তাদের মানুষ খলনায়ক মনে করে। এটাই উপযুক্ত সময় তাদের রাজনীতির সংশোধন করার। নতুবা বাংলাদেশের রাজনীতিতে এনসিপির নেতারা গণধিকৃত হবে।

সরকারের জন্য শিবিরের এই বিজয় অনেক বড় একটা বার্তা দেয়। প্রথমত, ইউনূস সরকার ভেবেছিল ছাত্ররাই তাদের নিয়োগকর্তা; বিশেষত প্রথম সারির কিছু সমন্বয়করাই মূলত আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড। কিন্তু এই ফলাফল প্রমাণ করে–তারা আসলে ছাত্রসমাজের প্রকৃত প্রতিনিধি নয়। ছাত্রসমাজের প্রকৃত প্রতিনিধি সাদিক কায়েমরাই। দ্বিতীয়ত, লন্ডন বৈঠকের পর ইউনূস সরকার বিএনপির দিকে ঝুঁকে পড়েছিল নিরপেক্ষ অবস্থান ছেড়ে। সংস্কার কমিশন সকল বিষয়ে বিএনপির দাবির কাছে অসহায় হয়ে পড়েছিল। যেন বিএনপিই সরকার গঠনে যাচ্ছে, তাই তাদের কথার বাইরে কিছু হবে না। ছাত্র সংসদ নির্বাচন সরকারের চোখে দেখিয়ে দিলো, বিএনপি বড় দল হতে পারে কিন্তু সবচেয়ে জনপ্রিয় দল নয়। তাই দেশ সংস্কারে শুধুমাত্র এক দলের মতামতের দিকে না তাকিয়ে দেশের মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রশাসনের কাছেও এই নির্বাচন বড় বার্তা দেয়। সবাই ভেবেছিল বিএনপি যেহেতু সরকারে আসতে যাচ্ছে, এখন ফেভার করলে সামনে কিছু ভালো সুবিধা পাওয়া যাবে। তাদের এখন ভাবতে হবে–আগামী নির্বাচনে অনেক কিছুই ঘটে যেতে পারে ডাকসু নির্বাচনের মতো। তাই সরকার ও প্রশাসনকে দেশের স্বার্থে যথাযথ আচরণ করতে হবে; কারও প্রতি পক্ষপাত করা চলবে না।

ডাকসু ও জাকসু নির্বাচন ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। বাংলাদেশের সেই সম্প্রদায়, যাদের এতদিন উপেক্ষা করা হয়েছিল, যাদের কখনো মূলধারার বিবেচনা করা হতো না; এই ডাকসু নির্বাচনের ফলাফল তাদের জন্য বিশেষ বার্তা নিয়ে এসেছে। শুধু বাংলাদেশের নয়; বিশ্বের সকল বঞ্চিত, নিপীড়িত ও মজলুমদের জন্য মুক্তির বার্তা নিয়ে এসেছে এই নির্বাচন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফিরে এসেছে তার মূলের দিকে। দেশ সংস্কারের যে আকাঙ্ক্ষা; সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ না হলে সামনে এক অনিবার্য বিপ্লব অপেক্ষা করছে, যা সমস্ত অন্যায় ও অনিয়ম ধ্বংস করে দেবে। কবির ভাষায়-

‘আমি আমার জনগণকে আরেকটি অনিবার্য বিপ্লবের জন্য প্রস্তুতি নেয়ার কথা বলছি, দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে যেভাবে রুখে দাঁড়ায় আক্রান্ত দুর্বল!

বিধ্বস্ত জাহাজ যাত্রীরা আঁকড়ে ধরে ভাসমান পাটাতন, তেমনি একাগ্রতা নিয়ে- আমি আপনাদেরকে আসন্ন বিপ্লবের জন্য প্রস্তুতি নেবার কথা বলছি।’

 

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, ছাত্র সংবাদ

 

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © 2025                                    Themes Create by BDITWork