আফগানিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলীয় হেরাত প্রদেশে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৭১ জন। নিহতদের মধ্যে ১৭ জন শিশু রয়েছে। ভয়াবহ এই দুর্ঘটনা ঘটেছে বুধবার (২০ আগস্ট) ভোরে, হেরাত প্রদেশের ইসলাম কালা সীমান্তবর্তী এলাকায়।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এবং আফগান সরকারি সূত্র জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন ইরান থেকে সম্প্রতি ফেরত পাঠানো আফগান শরণার্থী। তারা সবাই একটি যাত্রীবাহী বাসে করে ইসলাম কালা থেকে রাজধানী কাবুলের দিকে যাচ্ছিলেন। পথে বাসটি একটি ট্রাক ও একটি মোটরসাইকেলের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে এবং তাতেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে।
হেরাত প্রাদেশিক সরকারের মুখপাত্র আহমদুল্লাহ মুত্তাকি এবং স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত গতি এবং চালকের অবহেলার কারণেই দুর্ঘটনাটি ঘটে। বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রথমে একটি ট্রাকের সঙ্গে ধাক্কা খায়, পরে একটি মোটরসাইকেলের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এর পরপরই ভয়াবহ বিস্ফোরণের মাধ্যমে পুরো বাসে আগুন ধরে যায়, যা মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে।
প্রাদেশিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইউসুফ সাঈদি জানিয়েছেন, “নিহতদের অধিকাংশই বাসের যাত্রী। তবে ট্রাক ও মোটরসাইকেলে থাকা আরও চারজন দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। আহতদের মধ্যে অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক, ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।”
এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার একটি করুণ দিক হলো, নিহতদের বেশিরভাগই ছিলেন ইরান থেকে ফেরত আসা অভিবাসী আফগান নাগরিক। তালেবান সরকারের মুখপাত্র জবিউল্লাহ মুজাহিদ এক বিবৃতিতে দুর্ঘটনার খবর নিশ্চিত করে বলেন, “নিহতদের মধ্যে অধিকাংশই শরণার্থী, যাদের ইরান সম্প্রতি জোরপূর্বক ফেরত পাঠিয়েছে।”
গত কয়েক মাসে ইরান থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আফগান নাগরিককে দেশে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসকান্দার মোমেনি সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন, আগামী ২০২৬ সালের মার্চ মাসের মধ্যে আরও ৮ লাখ আফগানকে দেশ ছাড়তে হবে। এই নীতির ফলে অনেক আফগান বাধ্য হয়ে খারাপ পরিবহন ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে নিজেদের দেশে ফিরছেন, যা বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে।
দুর্ঘটনাটি কেবল একটি ট্র্যাজেডি নয়, বরং ইরান থেকে জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো আফগান শরণার্থীদের দুরবস্থা এবং আফগানিস্তানের ভঙ্গুর অবকাঠামোর একটি প্রতিচ্ছবি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিপুল সংখ্যক শরণার্থীকে একযোগে দেশে ফেরত পাঠানোর কারণে সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষে তাদের জন্য নিরাপদ পরিবহন, আশ্রয় ও সহায়তা নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো আফগান ও ইরানি উভয় সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, ফেরত পাঠানো অভিবাসীদের নিরাপত্তা, মানবিক সহায়তা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে যেন দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
দুর্ঘটনার পরপরই স্থানীয় প্রশাসন, তালেবান কর্তৃপক্ষ ও উদ্ধারকর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে এবং আহতদের নিকটস্থ হাসপাতালে স্থানান্তর করে। তবে অধিকাংশ মরদেহ এতটাই পুড়ে গেছে যে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
সরকারি সূত্র জানিয়েছে, দুর্ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু হয়েছে এবং যারা এই ঘটনায় দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।