কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি: নদীর ঢেউ খেলানো পানির শব্দ শুনলেই আতঙ্কে বুক ধড়ফড় করে মাযহারুল ইসলাম মাস্টারের। বছর ঘুরতেই যে নদী তার বসতভিটা, উঠান আর একর পর একর আবাদি জমি গিলে খেয়েছে! এক সময় যেখানে তার বাড়ি ছিল, আজ সেখানে বয়ে যাচ্ছে খরস্রোতা দুধ কুমর নদী। চোখ মুছতে মুছতে তিনি বললেন—
“আমাদের সব চলে গেছে। আজ ঘর ভাঙছে, কাল হয়তো জমিও থাকবে না। বাচ্চাদের নিয়ে কোথায় যাব? কিভাবে বাঁচবো?”
এমন গল্প শুধু মাযহারুলের নয়; একই বেদনায় কাঁদছে বামনডাঙ্গা ও বল্লভের খাস ইউনিয়নের শত শত পরিবার। কেউ হারিয়েছেন ঘর, কেউ বা ভিটেমাটি, কেউ আবার জমি হারিয়ে কৃষিকাজ থেকে ছিটকে পড়েছেন।
এই দুঃসহ বাস্তবতার প্রতিকার চেয়ে রবিবার (২৪ আগস্ট) বিকেল ৫টায় দুধ কুমর নদীর তীরে মানববন্ধনে দাঁড়ান ভাঙনকবলিত মানুষজন। হাত ধরে একে অপরের সঙ্গে জোট বাঁধেন নারী, পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ—সবার চোখেমুখে আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার ছাপ।
মানববন্ধনে অংশ নিয়ে আহাজারি করে কৃষক সাইফুর রহমান বলেন—
“আমাদের চাষের জমি সব নদীতে চলে গেছে। এখন আর পরিবারের খোরাক যোগানোর উপায় নেই। প্রতিদিন নদীকে দেখে মনে হয়, আজ না হয় কাল আমাকেও গিলে ফেলবে।”
মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন উপজেলা চর উন্নয়ন কমিটির আহ্বায়ক সহকারী অধ্যাপক গোলাম রসুল রাজা, প্রেসক্লাব সভাপতি মো. রফিকুল ইসলাম, সদস্য সচিব মো. ওমর ফারুক, বামনডাঙ্গা ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মিনারুল ইসলামসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।
তারা বলেন, প্রতিবছর ভাঙনের কারণে শত শত পরিবার বাস্তুচ্যুত হচ্ছে, অথচ কার্যকর কোনো প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ ও জরুরি ভাঙন প্রতিরোধ প্রকল্প হাতে নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
নদী তীরে দাঁড়িয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছিলেন বৃদ্ধা হাসিনা বেগম—
“আমার জীবনভর সঞ্চয় করা ঘরবাড়ি নদী খেয়ে ফেললো। এখন মেয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি। নিজের ভিটে না থাকলে মানুষ কেমন অসহায় হয়, সেটা না দেখলে বোঝা যায় না।”
অন্যদিকে শিক্ষার্থী ইমরান হোসেনের স্বপ্নও ভেঙে গেছে নদীর ভাঙনে। স্কুল থেকে ফিরে যেখানে বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা করত, সে মাঠটিও এখন নদীগর্ভে। সে বলল—
“আমাদের খেলার মাঠটাও নাই। বইয়ের কষ্ট আছে, নদীর ভয় আছে—সব মিলিয়ে ঠিকমতো পড়াশোনাও করতে পারি না।”
এলাকাবাসীর অভিযোগ, বহুদিন ধরে ভাঙন ঠেকাতে প্রশাসন শুধু প্রতিশ্রুতির আশ্বাস দিলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। ফলে বছর বছর দুকূলের গ্রাম নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
মানববন্ধনে বক্তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন—
“ভাঙন রোধে অবিলম্বে ব্যবস্থা না নিলে আমরা বৃহত্তর আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবো।