নিজস্ব প্রতিনিধি, কক্সবাজার: টানা ভারী বর্ষণে সৃষ্ট বন্যা ও পাহাড়ধসে কক্সবাজারে ভয়াবহ মানবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। গত সাত দিনের দুর্যোগে পানিতে ডুবে ও পাহাড়ধসে অন্তত ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সঙ্গে জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় তিন লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন।
সর্বশেষ শুক্রবার (১০ জুলাই) দুপুরে চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নে বসতবাড়ি প্লাবিত হওয়ায় নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সময় নৌকাডুবিতে হাসনাতুল জান্নাত ঝর্ণা (১২) নামে এক কিশোরীর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় তার দুই বোনকে জীবিত উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
এর আগে বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) বিকেলে চকরিয়া উপজেলার কাকারা ইউনিয়নে পানিতে ডুবে দুই বছরের শিশু মোহাম্মদ ওয়াকিমের মৃত্যু হয়। একই দিন সকালে মাতামুহুরী উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নে বন্যার পানিতে ভেসে গিয়ে প্রাণ হারায় তিন বছরের শিশু পুষ্প। এছাড়া ভোরে চকরিয়ার মছনিয়াকাটা এলাকায় পাহাড়ধসে একটি বসতঘরের ওপর মাটি চাপা পড়ে একই পরিবারের দুই শিশুর মৃত্যু হয়।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার সদর, চকরিয়া, পেকুয়া, মাতামুহুরী, রামু, উখিয়া, টেকনাফ, মহেশখালী, কুতুবদিয়া ও ঈদগাঁও উপজেলার ৩৫টি ইউনিয়নের অন্তত ১৫০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী উপজেলা।
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নূরুল ইসলাম বলেন, বান্দরবান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মাতামুহুরী নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।
চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীন দেলোয়ার জানান, চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলায় এক লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। দুর্গত মানুষের জন্য ৯৬টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। সেখানে আশ্রয় নেওয়া মানুষের মধ্যে শুকনো খাবারসহ প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামত এবং পানি নিষ্কাশনের জন্য স্লুইস গেট সচল রাখতে প্রশাসন কাজ করছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি হিসাবে শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫০ হাজার ৬৬২ জন। এর মধ্যে ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন ১৪ হাজার ৬১ জন।
দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারিভাবে ২০০ টন চাল, ৪৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ১২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ত্রাণ কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য জেলা প্রশাসনের কন্ট্রোল রুমও চালু রয়েছে।
এদিকে কক্সবাজার আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ছয় দিনে জেলায় ৭০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী দুই দিনও মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এতে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি এবং নতুন করে পাহাড়ধসের আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে সমুদ্রবন্দর ও উপকূলীয় এলাকার জন্য স্থানীয় সতর্ক সংকেত নম্বর ৩ বহাল রাখা হয়েছে।