মো. মামুন, নীলফামারী প্রতিনিধি: বোরো ধানের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে হতাশ নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার কৃষকরা এবার আমন চাষে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছেন। এরই মধ্যে উপজেলার বিভিন্ন মাঠে বীজতলা তৈরি, জমি প্রস্তুত ও চারা রোপণে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা। মাঠজুড়ে কৃষকের ব্যস্ততায় আমন আবাদ ঘিরে প্রাণচাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে।
তবে আমন মৌসুমের শুরুতেই ডিএপি ও টিএসপি সার চাহিদামতো না পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি খোলা বাজারে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে বলে দাবি করেছেন কৃষকরা। এতে আমন চাষের শুরুতেই উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা।
সরেজমিনে দেখা যায়, ভারত সীমান্তবর্তী ও তিস্তা নদীবেষ্টিত ডিমলা উপজেলার বিভিন্ন মাঠে কৃষকরা বীজতলা থেকে চারা সংগ্রহ করছেন। কেউ পাওয়ার টিলার দিয়ে জমি প্রস্তুত করছেন, আবার কেউ ব্যস্ত চারা রোপণে। অনেক জমিতে সদ্য রোপণ করা ধানের চারা সবুজ হয়ে উঠেছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি আমন মৌসুমে ডিমলা উপজেলায় ২২ হাজার ১২০ হেক্টর জমিতে আমন ধানের আবাদ হচ্ছে। এ মৌসুমে ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ২১ হাজার মেট্রিক টন।
উপজেলার কয়েকজন কৃষক জানান, বোরো মৌসুমের ধান এখনো ঘরে রয়েছে। বাজারে আশানুরূপ দাম না থাকলেও এক বুক আশা নিয়ে আমন চাষ শুরু করেছেন তারা। কিন্তু মৌসুমের শুরুতেই প্রয়োজন অনুযায়ী ডিএপি ও টিএসপি সার না পাওয়ায় তারা উদ্বিগ্ন।
কৃষকদের অভিযোগ, খোলা বাজারে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বস্তাপ্রতি ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা বেশি দামে ডিএপি ও টিএসপি সার কিনতে হচ্ছে। সরকার নির্ধারিত খুচরা মূল্য অনুযায়ী প্রতি বস্তা ডিএপি সারের দাম ১ হাজার ৫০ টাকা এবং টিএসপি সারের দাম ১ হাজার ৩৫০ টাকা। কিন্তু বাজারে এর চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।
কৃষকরা বলেন, সময়মতো চাহিদা অনুযায়ী সার না পেলে আমন উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে বাড়তি দামে সার কিনতে হলে উৎপাদন খরচ আরও বেড়ে যাবে। তাই সরকার নির্ধারিত মূল্যে পর্যাপ্ত সার সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
বরাদ্দের চিত্র
উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ডিমলা উপজেলায় বর্তমানে ১২ জন বিসিআইসি সার ডিলার ও ২০ জন বিএডিসি সার ডিলার রয়েছেন।
জুলাই ২০২৬ মাসে ডিমলা উপজেলায় ডিএপি, এমওপি ও টিএসপিসহ বিভিন্ন ধরনের সার বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ডিএপি ২০৪ মেট্রিক টন, এমওপি ২৪১ দশমিক ৮০ মেট্রিক টন এবং টিএসপি ৭৭ দশমিক ৭০ মেট্রিক টন বরাদ্দ রয়েছে।
বিসিআইসি ডিলারদের মাধ্যমে জুলাই মাসে ডিএপি ৮৪ মেট্রিক টন, এমওপি ৯৩ দশমিক ৬ মেট্রিক টন এবং টিএসপি ৩৩ দশমিক ৬ মেট্রিক টন বরাদ্দ দেওয়া হয়। কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, বরাদ্দের বিপরীতে বিসিআইসি ডিলাররা সব সার উত্তোলন করেছেন।
অন্যদিকে, জুলাই মাসে ১৯ জন বিএডিসি সার ডিলার বরাদ্দ পেয়েছেন। প্রত্যেক ডিলারের জন্য ৫ দশমিক ৭ মেট্রিক টন ডিএপি, ৭ দশমিক ৮ মেট্রিক টন এমওপি এবং ২ দশমিক ৪৫ মেট্রিক টন টিএসপি বরাদ্দ দেওয়া হয়। বিএডিসি ডিলাররাও বরাদ্দের বিপরীতে সব সার উত্তোলন করেছেন বলে কৃষি অফিস জানিয়েছে।
গয়াবাড়ী ইউনিয়নের বিসিআইসি সার ডিলার মেসার্স সিমা ট্রেডার্সের পরিচালক বলাই চন্দ্র সাহা বলেন, “আমাদের চাহিদা অনুযায়ী সার সরবরাহ করা যাচ্ছে না। যে কারণে মাঠপর্যায়ে কৃষকদের প্রত্যাশা অনুযায়ী সার দিতে সমস্যা হচ্ছে।”
কৃষি অফিসের তথ্যমতে, বর্তমানে বিসিআইসি ও বিএডিসি সার ডিলারদের কাছে ৬৪ দশমিক ৮০ মেট্রিক টন ডিএপি, ৯৯ দশমিক ৯০ মেট্রিক টন এমওপি এবং ২৪ দশমিক ৩০ মেট্রিক টন টিএসপি মজুত রয়েছে।
‘সারের কোনো ঘাটতি নেই’
রংপুর আঞ্চলিক বিএডিসি (সার)-এর যুগ্ম পরিচালক শহিদুল ইসলাম বলেন, “সারের কোনো ঘাটতি নেই। আগামী অক্টোবর পর্যন্ত সারের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। কৃষি বিভাগ যে পরিমাণ সারের চাহিদাপত্র পাঠায়, সে পরিমাণ সারই বরাদ্দ দেওয়া হয়।”
তিনি আরও বলেন, কোথাও সারের সংকট দেখা দিলে বা বেশি দামে বিক্রি করা হলে কোনো কোনো ডিলার বেশি লাভের আশায় কৃত্রিম সংকট তৈরি করে থাকতে পারেন। বিষয়টি কৃষি বিভাগ ও প্রশাসন মাঠপর্যায়ে তদারকি করছে বলেও জানান তিনি।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মীর হাসান আল বান্না বলেন, “বর্তমানে উপজেলায় কোনো ধরনের সারের সংকট বা ঘাটতি নেই। কৃষকরা সঠিক পরিমাণে সার প্রয়োগ করলে চলতি মৌসুমে বরাদ্দ ও মজুত থাকা সার দিয়ে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে।”
তিনি আরও বলেন, কেউ কৃত্রিমভাবে সার সংকট তৈরি করলে বা সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি করলে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, আমনের বীজতলা সাধারণত জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসে তৈরি করা হয়। শ্রাবণ-ভাদ্র মাসে মূল জমিতে চারা রোপণ করা হয় এবং অগ্রহায়ণ-পৌষ মাসে ধান কাটা শুরু হয়। চলতি মৌসুমে সঠিক পরিমাণে ও পরিমিত সার ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছে কৃষি বিভাগ।