তিন দফা দাবিতে দেশের সব প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে একযোগে চলছে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি। এতে বন্ধ হয়ে গেছে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, পরীক্ষা এবং অন্যান্য একাডেমিক কার্যক্রম। ‘প্রকৌশলী অধিকার আন্দোলন’ ব্যানারে দেশের প্রকৌশল শিক্ষার্থীরা এই কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন।
গতকাল বুধবার রাত ১০টায় রাজধানীর শাহবাগে এক সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকারীরা এই কর্মসূচির ঘোষণা দেন। আজ বৃহস্পতিবার সকাল থেকে দেশের সকল প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যত একাডেমিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে।
রাজশাহী, খুলনা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, রংপুর এবং ঢাকার বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়সহ (বুয়েট) দেশের সকল প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ আজ ছিল ফাঁকা। কোনো বিভাগেই ক্লাস কিংবা পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি। শিক্ষার্থীরা সক্রিয়ভাবে ক্লাস বর্জনের মাধ্যমে তাদের দাবির প্রতি সংহতি জানাচ্ছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ঘুরে দেখা গেছে—শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ, মানববন্ধন এবং মৌন পদযাত্রার মাধ্যমে তাদের অবস্থান তুলে ধরছেন।
গত বুধবার সকাল ১১টার দিকে বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীরা রাজধানীর শাহবাগ মোড় অবরোধ করেন। এর কিছু সময় পর, দুপুর দেড়টার দিকে, তারা প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন ‘যমুনা’র দিকে রওনা দিলে পুলিশের সঙ্গে উত্তেজনা শুরু হয়। ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের সামনে পুলিশ শিক্ষার্থীদের বাধা দিলে উভয় পক্ষের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়।
এ সময় পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড, কাঁদানে গ্যাস, জলকামান এবং লাঠিচার্জ করে শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। এতে বহু শিক্ষার্থী আহত হন। অনেকে রাস্তার পাশে আশ্রয় নেন এবং চিকিৎসা নেন কাছাকাছি ক্লিনিকগুলোতে।
তবে পুলিশি অভিযানের পরও আন্দোলন থেমে থাকেনি। বিকেল সাড়ে ৫টায় শিক্ষার্থীরা পুনরায় শাহবাগ মোড়ে সমবেত হন এবং রাত সাড়ে ১০টার দিকে দেশজুড়ে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ ঘোষণা দিয়ে শাহবাগ ত্যাগ করেন।
আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের তিনটি মৌলিক দাবি না মানা পর্যন্ত এই কর্মসূচি চলবে। দাবিগুলো হলো:
১. নবম গ্রেডের সহকারী প্রকৌশলী পদে কেবলমাত্র পরীক্ষা ভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে এবং সেখানে শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে ন্যূনতম বিএসসি ইন ইঞ্জিনিয়ারিং থাকতে হবে।
২. দশম গ্রেডে বর্তমানে কেবলমাত্র ডিপ্লোমাধারীরা আবেদন করতে পারেন, সেখানে উচ্চতর ডিগ্রিধারীদের (যেমন— বিএসসি ইন ইঞ্জিনিয়ারিং) আবেদনের সুযোগ রাখতে হবে।
৩. কেবলমাত্র বিএসসি ইন ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্নকারীরাই ‘প্রকৌশলী’ বা ‘ইঞ্জিনিয়ার’ পদবি ব্যবহার করতে পারবেন, তা নিশ্চিত করতে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, প্রকৌশল পেশায় বস্তুনিষ্ঠতা ও পেশাগত যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন হচ্ছে না। এতে প্রকৌশলীদের মর্যাদা, চাকরির সুযোগ ও পেশাগত স্বীকৃতি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ডিপ্লোমাধারীরা ও প্রকৌশলী ডিগ্রিধারীরা একই পদে আবেদন করতে পারছেন, যা দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, “যদি প্রকৌশল শিক্ষার দীর্ঘ, কঠিন এবং গবেষণামূলক পথ পাড়ি দিয়েও আমরা আলাদা করে স্বীকৃতি না পাই, তবে এই শিক্ষার কোনো মূল্য থাকল না।”
এ আন্দোলনের বিষয়ে এখনো সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে যোগাযোগ চলছে বলে জানিয়েছেন একাধিক সূত্র। শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করছেন, দিনের পর দিন দাবি জানিয়ে এলেও সরকার প্রতিনিয়ত এড়িয়ে যাচ্ছে প্রকৌশল পেশার কাঠামোগত সমস্যা।
চলমান আন্দোলন, অনির্দিষ্টকাল ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা শিক্ষার্থীরা জানিয়ে দিয়েছেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি চলবে। এর আওতায় সকল প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন করা হয়েছে।