তবে এত দীর্ঘ সময় শরণার্থীশিবিরে কাটিয়েও নিজেদের ঘর, ভূমি ও পরিচয়ে ফেরার স্বপ্ন দেখছেন রোহিঙ্গাদের বড় একটি অংশ। তাদের প্রধান দাবি—ফেরার আগে নিশ্চিত করতে হবে নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব, জমি-বাড়ির মালিকানা এবং মৌলিক অধিকার।
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইনে নিপীড়নের মুখে পরিবারের চার সদস্যকে নিয়ে উখিয়ার কুতুপালংয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন রোহিঙ্গা যুবক মোহাম্মদ আরিফুল্লাহ। তিনি বলেন, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হাত থেকে প্রাণ বাঁচাতে আট দিন হেঁটে বাংলাদেশে এসেছিলেন। সেই ভয়াবহ স্মৃতি এখনো তাকে কাঁদায়। তবু নিজের দেশ মিয়ানমারে ফিরে যেতে চান তিনি।
শুধু আরিফুল্লাহ নন, দীর্ঘ শরণার্থীজীবনের পরও অনেক রোহিঙ্গার প্রত্যাশা নিজ দেশে ফিরে যাওয়া। কিন্তু রাখাইনের বর্তমান পরিস্থিতি সেই প্রত্যাবাসনকে আরও জটিল করে তুলেছে।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সবচেয়ে বড় বাধা এখন রাখাইনের চলমান যুদ্ধ। মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির সংঘাতের কারণে রাজ্যটির বড় অংশ এখনো অস্থিতিশীল। এর ফলে প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে তৈরি হয়েছে নতুন বাস্তবতা ও অনিশ্চয়তা।
২০২৪ ও ২০২৫ সালেও রাখাইনে সংঘাতের কারণে নতুন করে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে ১২ লাখের বেশি বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা রয়েছেন। তাদের অধিকাংশই উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি ক্যাম্পে বসবাস করছেন।
প্রত্যাবাসনের পর নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত হবে কি না—এটাই রোহিঙ্গাদের অন্যতম বড় উদ্বেগ। ইউএনএইচসিআরের কক্সবাজার সাব-অফিসের প্রধান মার্সেল কলুনের মতে, চলমান সংঘাত বন্ধ হওয়া প্রত্যাবাসনের অন্যতম প্রধান শর্ত। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, নিজ ভূমিতে ফেরার সুযোগ, জমি-বাড়ির অধিকার ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করাও জরুরি।
নাগরিকত্বের বিষয়টিও বড় প্রশ্ন হয়ে আছে। মিয়ানমারের ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনের কারণে রোহিঙ্গাদের বড় একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রহীন অবস্থায় রয়েছে। নাগরিকত্ব ও সমঅধিকার নিশ্চিত না হলে প্রত্যাবাসন টেকসই হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অধিকারকর্মী সৈয়দ উল্লাহ বলেন, রোহিঙ্গাদের কাছে একমাত্র সমাধান নিরাপদ প্রত্যাবাসন।
প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে রোহিঙ্গাদের তালিকা যাচাইও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।
দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ রোহিঙ্গার তালিকা দিয়েছে। গত ৩১ জুলাই পর্যন্ত মিয়ানমার ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য যাচাই করেছে। এর মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।
এটিকে প্রক্রিয়ার অগ্রগতি হিসেবে দেখা হলেও এখনো তা বাস্তব প্রত্যাবাসনে রূপ নেয়নি। মিয়ানমার জানিয়েছে, নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে যাচাই করা ব্যক্তিদের ফিরিয়ে নেওয়া হবে।
প্রত্যাবাসন হলে রোহিঙ্গারা নিজেদের পুরোনো গ্রামে ফিরতে পারবেন কি না, জমি-বাড়ির মালিকানা ফিরে পাবেন কি না কিংবা সেখানে কাজ ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের অধিকার থাকবে কি না—এসব প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত।
কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন, শুধু মানুষকে সীমান্তের ওপারে পাঠিয়ে দেওয়াই প্রত্যাবাসন নয়। মর্যাদার সঙ্গে ফেরার নিশ্চয়তা থাকতে হবে।
দীর্ঘ ৯ বছরে রোহিঙ্গা সংকটের প্রভাব পড়েছে উখিয়া-টেকনাফের স্থানীয় জনজীবন, পরিবেশ, অর্থনীতি ও নিরাপত্তায়। স্থানীয়রাও চান, রোহিঙ্গারা নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে নিজ দেশে ফিরে যাক।
শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের একার নয়; এটি এখন আন্তর্জাতিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। প্রত্যাবাসনের রূপরেখা প্রণয়নসহ সংকট সমাধানে সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে।
আন্তর্জাতিক চাপ, বাংলাদেশ-মিয়ানমারের আলোচনা এবং তালিকা যাচাই অব্যাহত থাকলেও বাস্তবে ৯ বছরে একজন রোহিঙ্গাকেও স্থায়ীভাবে নিজ দেশে ফেরানো সম্ভব হয়নি। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর থেকে দিনটি রোহিঙ্গারা ‘রোহিঙ্গা গণহত্যা স্মরণ দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছেন।
নিজ ভূমিতে ফেরার আকাঙ্ক্ষা থাকলেও নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব, অধিকার ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত সেই প্রত্যাবাসনের পথ যে এখনো দীর্ঘ—রোহিঙ্গাদের বর্তমান বাস্তবতাই তার প্রমাণ।