বিশেষ প্রতিনিধি: বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ছয় মাসে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের বৈপরীত্য দেখা দিয়েছে। অর্থনীতির ৩১টি প্রধান সূচকের মধ্যে ১২টিতে অগ্রগতি হলেও মূল্যস্ফীতি, মাথাপিছু ঋণসহ ১৯টি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে অবনতি ও গভীর শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সোমবার (২৪ আগস্ট) রাজধানীর একটি মিলনায়তনে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘সরকারের ছয় মাস: পারফরম্যান্স পর্যালোচনা’ শীর্ষক মিডিয়া ডায়ালগে এসব তথ্য ও বিশ্লেষণ তুলে ধরেন সংস্থাটির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
সিপিডির পর্যালোচনায় বলা হয়, নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন সরকারের ১৮০ দিন পূর্ণ হলেও দেশের অর্থনীতি প্রত্যাশিত গতিতে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমে ৩ শতাংশের নিচে নেমেছে। পাশাপাশি রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে এবং গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে শিল্প খাতে নতুন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় মূল্যস্ফীতি, তারল্য সংকট ও বাজারের অস্থিতিশীলতার যে চ্যালেঞ্জ ছিল, ছয় মাস পরও সেগুলোর পুরোপুরি সমাধান হয়নি বলে মনে করছে সিপিডি।
সিপিডির গবেষণায় সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মূল্যায়নে ৩১টি প্রধান সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রবাসী আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভসহ ১২টি সূচকে ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা গেছে। তবে বাকি ১৯টি সূচকে অবনতি হয়েছে।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, নতুন সরকারের কাছে জনগণের প্রধান দুটি প্রত্যাশা ছিল—অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু ছয় মাসের সার্বিক পর্যালোচনায় এই দুটি ক্ষেত্রেই আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি দেখা যায়নি। বরং উভয় ক্ষেত্রেই এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার আগের সরকারের কাছ থেকে একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছে। তার মধ্যে ছিল তারল্য সংকট, দুর্বল ব্যাংকিং খাত, অনাদায়ী ঋণ, অর্থ পাচার ও রাজস্ব ঘাটতির মতো বড় চ্যালেঞ্জ। তবে এসব সমস্যা মোকাবিলা করে অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করানোর ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত গতি দেখা যায়নি।
সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি প্রসঙ্গে ড. দেবপ্রিয় বলেন, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, সিন্ডিকেট ও ‘মব কালচার’ বন্ধ করা ছিল সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতিতে এসব ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের প্রতিশ্রুতি থাকলেও রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা গ্রহণযোগ্য নয়। সরকারের পক্ষ থেকে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা করা হলেও দেশে মব সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে। নারী, শিশু ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটছে। এসবের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়নি।
গুম প্রতিকার ও মানবাধিকার সুরক্ষায় প্রণীত আইন নিয়েও বিভিন্ন ত্রুটির কথা তুলে ধরেন তিনি। বিশেষ করে আইন লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দিয়ে অনুসন্ধান পরিচালনার সুযোগ থাকলে সেখানে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হতে পারে বলে মন্তব্য করেন ড. দেবপ্রিয়।
তিনি আরও বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তারা কী ধরনের সংকটের মুখোমুখি হয়েছিল, সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট ও সমন্বিত দলিল তৈরি করা হয়নি। ফলে সরকারের পক্ষ থেকে সংকটের কথা বলা হলেও এর পেছনে প্রয়োজনীয় তথ্যভিত্তিক পরিসংখ্যান অনেক ক্ষেত্রে অনুপস্থিত।
তবে সরকারের নেওয়া কয়েকটি উদ্যোগের প্রশংসাও করেছেন ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। সংসদ সদস্যদের গাড়ি ও প্লট না নেওয়ার সিদ্ধান্ত, রামিসা হত্যা মামলার দ্রুত বিচার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং বাজেটে করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানোর বিষয়গুলোকে তিনি ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেন।
তবে তিনি বলেন, অর্থনীতিকে দ্রুত সচল করতে বিচ্ছিন্ন কিছু উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। এর পরিবর্তে প্রয়োজন সমন্বিত ও ধারাবাহিক সংস্কার কর্মসূচি। অর্থনীতি ও সুশাসন—দুই ক্ষেত্রেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে হলে সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি ও তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে।