খুলনা: উপকূলীয় শিল্পনগরী খুলনায় ভয়াবহ রূপ নিয়েছে ডেঙ্গু পরিস্থিতি। দিন দিন বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। একই সঙ্গে রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলো। নির্ধারিত শয্যা পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় অনেক রোগীকে বারান্দা, করিডোর ও মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।
খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) পক্ষ থেকে মশক নিধন, ওষুধ ছিটানো ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও কমছে না এডিস মশার উপদ্রব। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নগরীর ১০টি ওয়ার্ডকে রেড জোন ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি ডেঙ্গু প্রতিরোধে সাধারণ মানুষকে সচেতন হওয়ার এবং বাসাবাড়ি ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখার আহ্বান জানিয়েছে কেসিসি ও স্বাস্থ্য বিভাগ।
খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগের সরকারি হাসপাতালগুলোতে ২২৩ জন এবং বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালে ৬০ জনসহ মোট ২৮৩ জন নতুন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে খুলনা জেলাতেই সর্বোচ্চ ১৪৬ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এ ছাড়া খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন আরও ৫৫ জন।
চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত খুলনা বিভাগে মোট ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৮৪৮ জনে। এদের মধ্যে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৪ হাজার ৯৫৪ জন। এ সময়ে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে ২০ জনের। বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ৭৬০ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি বছরে খুলনা বিভাগে ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ২০ জনের মধ্যে ১৯ জনই খুলনা জেলার। অন্য একজন মারা গেছেন বাগেরহাটে।
জুলাইয়ের শেষ পর্যন্ত সাত মাসে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছিল ৮ জনের। আর শুধু আগস্ট মাসেই মারা গেছেন ১২ জন। অর্থাৎ চলতি বছরের আট মাসের মধ্যে আগস্টেই ডেঙ্গুতে সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
ডেঙ্গু রোগীর চাপ সবচেয়ে বেশি খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এ হাসপাতালে এ পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৩৮৯ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালটিতে ১৯৯ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জেনারেল হাসপাতালে সরেজমিনে দেখা গেছে, ডেঙ্গু রোগীদের উপচে পড়া ভিড়। নির্ধারিত ডেঙ্গু ওয়ার্ডে জায়গা না থাকায় বারান্দা, মেঝে ও করিডোরে বেড বসিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। শিশু ওয়ার্ডেও রোগীর চাপ বেড়েছে। চিকিৎসক ও নার্সরা নিরবচ্ছিন্ন সেবা দিলেও শয্যা ও জনবল সংকটে বাড়ছে চাপ।
খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য নির্ধারিত ১৫টি বেড থাকলেও বর্তমানে ভর্তি রয়েছেন ৫২ জন। অর্থাৎ নির্ধারিত ধারণক্ষমতার প্রায় চারগুণ রোগীকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সংকটকালীন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন ওয়ার্ড ও কেবিনে রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে খুলনার আদ্-দীন হাসপাতালেও রোগীর চাপ বেড়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বর্তমানে সেখানে ৬০ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন এবং একক বেড দেওয়ার মতো পরিস্থিতি নেই।
খুলনা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার ডা. হিমেল ঘোষ বলেন, প্রতি বছর জুলাইয়ের পর ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বাড়তে থাকে। বর্ষা ও বর্ষার শেষে জমে থাকা পানিতে এডিস মশার বংশবিস্তার হওয়ায় এ সময় মশার উপদ্রবও বেড়ে যায়। তাঁর মতে, নভেম্বর-ডিসেম্বর থেকে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমতে পারে।
খুলনার ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. মো. শওকত আলী বলেন, জমে থাকা পানিতে এডিস মশার বংশবিস্তার হয়। বর্তমানে স্বচ্ছ পানির পাশাপাশি ময়লাযুক্ত পানিতেও এ মশার বংশবিস্তার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাসপাতালগুলোতে শয্যা বাড়ানো, প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ এবং মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে।
খুলনা সিভিল সার্জন কার্যালয় জানিয়েছে, জেলার সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডেঙ্গু আইসোলেশন ইউনিট বা ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। প্রতিটি ইউনিটে অন্তত পাঁচটি করে শয্যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। নরমাল স্যালাইন, খাবার স্যালাইন, প্যারাসিটামলসহ প্রয়োজনীয় ওষুধের মজুত রয়েছে। ভর্তি রোগীদের জন্য মশারি এবং ডেঙ্গু শনাক্তকরণে প্রয়োজনীয় পরীক্ষার কিটও মজুত রাখা হয়েছে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে খুলনা সিটি করপোরেশন পুরো নগরীতে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম চালু করেছে। সংক্রমণ ও লার্ভার ঘনত্বের ভিত্তিতে নগরীর ৩১টি ওয়ার্ডকে রেড, অরেঞ্জ ও ইয়েলো—এই তিন জোনে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১০টি ওয়ার্ডকে রেড জোন ঘোষণা করা হয়েছে।
রেড জোনের ওয়ার্ডগুলো হলো—১৭, ১৮, ২২, ২৩, ২৪, ২৫, ২৭, ২৮, ২৯ ও ৩০। এসব এলাকায় প্রতিদিন গড়ে ৭০ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছেন বলে নগর স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য জানানো হয়েছে।
ডেঙ্গু রোগীদের জন্য ১৭, ২২ ও ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে বিনামূল্যে চিকিৎসা ক্যাম্প চালু করেছে কেসিসি। এসব ক্যাম্পে নাপা ট্যাবলেট ও স্যালাইন সরবরাহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতিদিন সকালে লার্ভা ধ্বংসে ‘অ্যাবেট’ স্প্রে এবং বিকেলে ফগিংয়ের মাধ্যমে মশক নিধন কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
এডিস মশার বংশবিস্তার রোধে নগরীর বাসাবাড়ি, নির্মাণাধীন ভবন, ড্রেন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছে কেসিসি। কোথাও জমে থাকা পানি বা এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক জরিমানা করা হচ্ছে।
কেসিসি প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে তিন মাস আগে থেকেই কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করে মাঠপর্যায়ে কাজ করানো হচ্ছে। তবে শুধু সিটি করপোরেশনের ওষুধ ছিটানো দিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। নগরবাসীকেও নিজ নিজ বাড়ি ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখতে হবে।
তিনি বাসাবাড়ির টব, এসি, ছাদ, ড্রেন ও অন্যান্য স্থানে পানি জমে আছে কি না, তা নিয়মিত পরীক্ষা করার আহ্বান জানান।
ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে প্রশাসনিক উদ্যোগের পাশাপাশি রাজনৈতিক দল ও অঙ্গসংগঠনগুলোকেও মাঠে দেখা যাচ্ছে। মহানগর বিএনপি খুলনার পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে দ্রুত খুলনাকে ‘মহামারি এলাকা’ ঘোষণার দাবি জানিয়েছে। দলটির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো বিভিন্ন ওয়ার্ডে মশক নিধন, সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ, রক্তদান এবং হাসপাতালে রোগীদের খোঁজখবর নেওয়ার মতো কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
অন্যদিকে আড়ংঘাটা থানা জামায়াতে ইসলামীর উদ্যোগেও ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। খুলনা মহানগর জামায়াতে ইসলামীর আমির মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধ কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের একার দায়িত্ব নয়; এটি একটি সামাজিক উদ্যোগ। জনগণের সচেতনতা ও সক্রিয় অংশগ্রহণই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের কার্যকর পথ।
স্বাস্থ্য বিভাগের পাশাপাশি সিটি করপোরেশন, রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগ চললেও খুলনায় ডেঙ্গুর সংক্রমণ এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি। হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ এবং আগস্টে মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশক নিধনের পাশাপাশি নগরবাসীর সচেতনতা ও নিজ নিজ বাসাবাড়িতে জমে থাকা পানি অপসারণকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।