অনলাইন নিউজ: বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাসের মধ্যেই রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন, গণভোটের রায় কার্যকর, রাষ্ট্র সংস্কার, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট নিরসনসহ বিভিন্ন দাবিতে রাজপথে সরব হয়েছে বিরোধী দলগুলো। পাল্টা সরকারও কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ঢাকা-চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চ কর্মসূচি পালন করে। দাবি আদায় না হলে আরও কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দিয়েছে জোটটি। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ছয় দফা দাবি পূরণ না হলে আন্দোলন এক দফায় রূপ নিতে সময় লাগবে না।
বিরোধী দলগুলোর দাবির মধ্যে রয়েছে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-তেল-গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব দাবির কিছু বিষয়ে সরকারের সঙ্গে বিরোধী দলগুলোর মতপার্থক্য থাকলেও অনেক সমস্যার সমাধানে সরকারকে সময় দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকারের সমালোচনা ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অধিকার বিরোধী দলের রয়েছে। তবে তা যেন সহিংসতা বা অস্থিতিশীলতায় রূপ না নেয়, সেদিকেও সতর্ক থাকা জরুরি।
সুশাসনের জন্য নাগরিক—সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, সরকারের ত্রুটি তুলে ধরা বিরোধী দলের স্বাভাবিক দায়িত্ব। তবে সমালোচনার পাশাপাশি গঠনমূলক প্রস্তাবও থাকা প্রয়োজন। সরকার ও বিরোধী দল পরস্পরের সঙ্গে সংঘাতের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের পথ খুঁজতে পারে।
অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমানের মতে, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা উচিত সাধারণ মানুষের কল্যাণ ও দেশের উন্নয়ন। ক্ষমতার পরিবর্তন বা রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব কোনোভাবেই জনস্বার্থের চেয়ে বড় হওয়া উচিত নয়।
সংবিধান সংস্কারের পদ্ধতি নিয়েও সরকার ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। বিএনপি সংবিধান সংশোধনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং এ বিষয়ে বিশেষ কমিটি গঠন করেছে। বিপরীতে জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গণভোটের রায় অনুযায়ী সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি জানাচ্ছে।
এদিকে সংসদের বিভিন্ন স্থায়ী কমিটিতে বিরোধী দলকে সভাপতির পদ না দেওয়ার বিষয়টিও রাজনৈতিক দূরত্ব বাড়িয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সংসদের পাশাপাশি রাজপথেও পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও কর্মসূচির কারণে উত্তেজনা বাড়ছে।
সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান অভিযোগ করেছেন, চলমান সংকটকে পুঁজি করে কেউ কেউ বিভ্রান্তি ছড়িয়ে অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। অরাজকতা সৃষ্টি হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি সতর্ক করেছেন।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান সরকারের সমালোচনা করে বলেছেন, বর্তমান সরকারও আগের সরকারের মতো একই পথে হাঁটছে। তবে তিনি দাবি করেছেন, তাদের আন্দোলনের উদ্দেশ্য সরকারকে বিদায় করা নয়।
এনসিপির নেতারা অবশ্য সরকারের ছয় মাসের কার্যক্রমকে ব্যর্থ বলে দাবি করছেন। তাদের ভাষ্য, সংসদে বিভিন্ন বিষয়ে কার্যকর সমাধান না হওয়ায় তারা বাধ্য হয়ে রাজপথে আন্দোলনে নেমেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে বিরোধ আরও বাড়লে এর সুযোগ নিতে পারে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ। তাই জাতীয় স্বার্থে সরকার ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে সংলাপ, সহনশীলতা ও রাজনৈতিক সমঝোতা জরুরি বলে মনে করছেন তারা।
সব মিলিয়ে, সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ছয় মাসের মাথায় রাজপথে বিরোধী দলের কঠোর অবস্থান সরকারের জন্য নতুন রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে। পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা অনেকটাই নির্ভর করবে সরকার ও বিরোধী দলগুলোর পারস্পরিক রাজনৈতিক আচরণ এবং আলোচনার সক্ষমতার ওপর।