হতভম্ব ব্যাংক কর্মী ও গ্রাহকরা
বাংলাদেশে কার্যরত যুক্তরাজ্যভিত্তিক বহুজাতিক ব্যাংক এইচএসবিসি (দ্য হংকং অ্যান্ড সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশন) দেশজুড়ে একদিনেই ৩ শতাধিক কর্মীকে ছাঁটাই করেছে। আকস্মিকভাবে দেওয়া এই ছাঁটাইয়ের নোটিশে দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত অনেক অভিজ্ঞ কর্মকর্তা পর্যন্ত বাদ পড়েছেন।
অনেকেই এ ঘটনার পর হতবাক। চাকরি হারানো কর্মীরা বলছেন, তারা পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। অনেকের কয়েক বছরের মধ্যে অবসরে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু এখন নতুন করে চাকরি খুঁজতে বাধ্য হচ্ছেন। একদিকে দেশের ব্যাংকিং খাতের সংকটময় পরিস্থিতি, অন্যদিকে বয়সের সীমা—সব মিলিয়ে পুনরায় চাকরি পাওয়া অনেকের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে।
ধানমণ্ডি শাখার একজন বর্ষীয়ান কর্মকর্তা বার্তা২৪.কমকে জানান, তাকে ২০০১ সালে এইচএসবিসিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। ২৪ বছর ধরে নিরবিচারে কাজ করে গেলেও তাকেও ছাঁটাইয়ের তালিকায় রাখা হয়েছে। তার ভাষায়, “আমাদের জানানো হয়েছে, আগামী ৩১ মার্চ হবে আমাদের শেষ কর্মদিবস। চাইলে এর আগেও রিজাইন দিয়ে চলে যেতে পারি।”
তিনি বলেন, “ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তিকে ভিন্ন শর্তে সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে। তবে আমরা আমাদের যৌক্তিক দাবিগুলো কর্তৃপক্ষের কাছে পেশ করেছি। এখনো তারা আমাদের দাবির প্রতি কোনো সম্মান দেখাচ্ছে না।”
এইচএসবিসি বাংলাদেশ গত ৩০ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেয় যে, তারা দেশে রিটেইল (খুচরা) ব্যাংকিং সেবা বন্ধ করে দিচ্ছে। এর পরপরই কর্মীদের একসঙ্গে অব্যাহতির প্রক্রিয়া শুরু করে।
রিটেইল ব্যাংকিংয়ের আওতায় ছিল: ব্যক্তিগত হিসাব, গাড়ি ও গৃহঋণ, বিমা, মেয়াদি আমানত, ব্যক্তিগত অর্থায়ন, এসব সেবার মধ্যে প্রচলিত ও শরিয়াহ উভয় ধরণের প্রোডাক্ট ছিল। এখন নতুন করে কোনো গ্রাহক এই সেবার আওতায় নেওয়া হচ্ছে না।
ব্যাংকটি গ্রাহকদের তাদের হিসাব দ্রুত বন্ধ করে অন্যত্র স্থানান্তরের নির্দেশনা দিয়েছে। এতে গ্রাহকদের মধ্যে উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে যারা শিক্ষা ঋণ, উচ্চশিক্ষার জন্য স্টুডেন্ট ফাইল বা দীর্ঘমেয়াদি ঋণ কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন। তাদের অনেকেই বলছেন, মাঝপথে ব্যাংক পরিবর্তন করা জটিল এবং সময়সাপেক্ষ।
২০২৪ সালের আর্থিক বিবরণীতে দেখা যায়, এইচএসবিসি বাংলাদেশে রেকর্ড পরিমাণ ১ হাজার ৮৬ কোটি টাকা মুনাফা করেছে।
আমানত: ২২,৬৯৬ কোটি টাকা
ঋণ ও অগ্রিম: ১৮,৯২৮ কোটি টাকা
ঋণ থেকে সুদের আয়: ১,৯০৮ কোটি টাকা (১২% বৃদ্ধি)
আমানতের সুদের খরচ: ২০% কমে ৬১৫ কোটি টাকা
এই বিপুল মুনাফার মধ্যেও কেন হঠাৎ করে রিটেইল সেবা বন্ধ এবং কর্মী ছাঁটাই—সে প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকরা। অনেকেই মনে করছেন, এটি বৈশ্বিক ব্যবসায়িক কৌশলের অংশ, তবে মানবিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতার ঘাটতি রয়েছে স্পষ্টভাবে।
বিশ্বজুড়ে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের ইতিহাস
এইচএসবিসি গত কয়েক বছর ধরেই বিশ্বজুড়ে বিতর্কের জন্ম দিয়ে আসছে।
২০২২ সালে যুক্তরাজ্যে একসঙ্গে ১১৪টি শাখা বন্ধ করে দেয়। করোনাকালে বিপুল কর্মী ছাঁটাই করে প্রতিষ্ঠানটি। বাংলাদেশে একসময় জঙ্গি অর্থায়নের অভিযোগও ওঠে এই ব্যাংকের বিরুদ্ধে।
ব্যাংক কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া নেই, ব্যাংকটির জনসংযোগ বিভাগে কর্মরত নওরিন ইসলাম প্রথমে জানান, “এই বিষয়ে কিছু বলা যাবে না, কারণ এটি কনফিডেনসিয়াল।” পরে আবারো বার্তা২৪.কম থেকে লিখিতভাবে প্রশ্ন পাঠানো হলেও ব্যাংকের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া মেলেনি।
গ্রাহক ও কর্মীদের উদ্বেগ, ধানমণ্ডি শাখায় কথা বলার সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে বারবার ফোন দিচ্ছিলেন উদ্বিগ্ন গ্রাহকরা। আবার কাউন্টারে আসা অনেক সিনিয়র সিটিজেনও এ নিয়ে প্রশ্ন করছিলেন। তাদের অনেকেই বলেন, এইচএসবিসির মতো একটি প্রিমিয়াম ব্যাংক যদি এমন আচরণ করে, তাহলে সাধারণ মানুষের ভরসা কোথায়?