উত্তরের জনপদের যুগান্তকারী যোগাযোগ উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি নিয়ে অবশেষে গাইবান্ধার হরিপুর-চিলমারী এলাকায় তিস্তা নদীর ওপর নির্মিত ‘মাওলানা ভাসানী সেতু’ উদ্বোধনের অপেক্ষায়। আগামী বুধবার, ২০ আগস্ট, দীর্ঘ ১১ বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে সেতুটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করবেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।
সেতু উদ্বোধনের বিষয়টি মঙ্গলবার (১৯ আগস্ট) সকালে নিশ্চিত করেছেন এলজিইডির গাইবান্ধার নির্বাহী প্রকৌশলী উজ্জ্বল চৌধুরী। তিনি জানান, “আমরা ইতোমধ্যে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি। ফলক উন্মোচনের পর উপদেষ্টা মহোদয় স্থানীয় জনসাধারণ, সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যমের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন।”
দেশের ইতিহাসে এলজিইডির সবচেয়ে বড় প্রকল্প সেতুটি নির্মাণ করা হয়েছে বাংলাদেশ সরকার ও সৌদি ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্ট (SFD)-এর যৌথ অর্থায়নে। চায়না স্টেট কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে নির্মিত এই পিসি গার্ডার সেতুটি দৈর্ঘ্যে ১,৪৯০ মিটার এবং প্রস্থে ৯.৬ মিটার। ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮৮৫ কোটি টাকা।
এটি শুধু এলজিইডির সবচেয়ে বড় প্রকল্প নয়, বরং দেশের উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন দিগন্তের সূচনা করতে যাচ্ছে। সেতুকে ঘিরে নির্মাণ করা হয়েছে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ এক্সেস রোড, যার মধ্যে রয়েছে ৫৮টি বক্স কালভার্ট ও ৯টি আরসিসি সেতু। এতে করে সুন্দরগঞ্জ, চিলমারী, সাদুল্যাপুরসহ অন্তত ১০টি বাজার ও একাধিক মহাসড়ক সরাসরি সংযুক্ত হচ্ছে একসাথে।
সেতুটির প্রভাব: অর্থনীতি, পরিবহন ও জীবনযাত্রায় বিপ্লব এই সেতু চালু হলে গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম জেলার মধ্যে সড়কপথে সরাসরি সংযোগ স্থাপিত হবে। এর ফলে:
ভূরুঙ্গামারী স্থলবন্দরসহ দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোর সঙ্গে দূরত্ব ৪০ থেকে ১০০ কিলোমিটার কমবে।
শিল্প ও কৃষিজ পণ্য পরিবহন সহজ হবে, খরচ ও সময় সাশ্রয় হবে। স্থানীয়ভাবে কারখানা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প গড়ে তোলার সুযোগ বাড়বে। পর্যটনের নতুন করিডোর সৃষ্টি হবে। দারিদ্র্য হ্রাস, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিক্ষা-স্বাস্থ্য সুবিধা বাড়বে। এছাড়া এটি দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে স্থায়ী অবদান রাখবে।
সেতুটির নামকরণ নিয়ে স্থানীয়ভাবে কিছুটা অসন্তোষ বিরাজ করছে। স্থানীয় সরকার বিভাগ সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সেতুটির নামকরণ করেছে ‘মাওলানা ভাসানী সেতু, গাইবান্ধা’। কিন্তু অনেকেই দাবি করছেন, এই সেতুর স্বপ্নদ্রষ্টা ও দীর্ঘদিনের আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তি ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা শরিতুল্যাহ মাস্টার।
স্থানীয়রা মনে করেন, শরিতুল্যাহ মাস্টার ছিলেন তিস্তা সেতু বাস্তবায়ন আন্দোলনের মূল সংগঠক, যিনি ১৯৯৫ সাল থেকে এককভাবে আন্দোলন চালিয়ে যান। গঠন করেন ‘তিস্তা সেতু বাস্তবায়ন কমিটি’। তার অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে সেতুটির নাম ‘শরিতুল্যাহ মাস্টার তিস্তা সেতু’ করার দাবি জানিয়ে মানববন্ধন, স্মারকলিপি প্রদানসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছেন এলাকাবাসী।
২০১৪ সালের ২৫ জানুয়ারি, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সে ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করেছিলেন। পরে বিভিন্ন সময়ে উদ্বোধনের তারিখ পরিবর্তন হয়। অবশেষে এবার ২০ আগস্ট, পঞ্চম দফায় নির্ধারিত দিনে সেতু উদ্বোধন হচ্ছে।
এলাকাবাসীর আশা, দীর্ঘদিনের এ স্বপ্নসেতু খুলে দেবে উত্তরাঞ্চলের জন্য অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত।