নিজস্ব প্রতিবেদক: একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য দেশের সরকারি-বেসরকারি কলেজগুলোতে ২৫ লাখের বেশি আসন রয়েছে। অথচ চলতি বছর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ এখনো একাদশে ভর্তির আবেদনই করেনি। ফলে শহরের নামি কলেজগুলোতে পছন্দের আসন নিয়ে প্রতিযোগিতা থাকলেও মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলের অনেক কলেজে দেখা দিয়েছে তীব্র শিক্ষার্থী সংকট।
বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, এবার এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে ১১ লাখ ৪৩ হাজার ৪৬২ জন। এর বিপরীতে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য আবেদন করেছে ৯ লাখ ৯৫ হাজার ২৩০ জন। অর্থাৎ মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়েও ১ লাখ ৪৮ হাজার ২৩২ জন শিক্ষার্থী এখনো উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তির প্রক্রিয়ায় আসেনি। তবে তাদের কতজন অন্য কোনো শিক্ষাব্যবস্থায় যাচ্ছে এবং কতজন পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়ছে—এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
দেশে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য আসন রয়েছে ২৫ লাখের বেশি। বিপরীতে ভর্তির যোগ্য শিক্ষার্থী ১১ লাখ ৪৩ হাজার ৪৬২ জন। ফলে সব উত্তীর্ণ শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও বিপুলসংখ্যক আসন খালি থাকবে।
তবে রাজধানী ও বড় শহরের নামি কলেজগুলোর পরিস্থিতি ভিন্ন। ভালো ফল করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তির আগ্রহ বেশি থাকায় নির্দিষ্ট আসনের বিপরীতে প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে শহর থেকে দূরের মফস্বল ও গ্রামীণ কলেজগুলো শিক্ষার্থী সংকটে পড়ছে।
কলেজসংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্থানীয় মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর ফলাফল এবং শিক্ষার্থীদের শহরমুখী প্রবণতার কারণে গ্রামীণ কলেজগুলোতে এই সংকট আরও প্রকট হচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী স্থানীয় কলেজে ভর্তি না হয়ে জেলা বা বড় শহরের তুলনামূলক ভালো প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার প্রভাব শুধু শ্রেণিকক্ষের উপস্থিতিতে সীমাবদ্ধ নয়। বিশেষ করে বেসরকারি ও স্থানীয় পর্যায়ের অনেক কলেজের আয়-ব্যয় শিক্ষার্থীসংখ্যার ওপর নির্ভরশীল। ভর্তি ও টিউশন ফি থেকে আয় কমে গেলে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণসহ নিয়মিত ব্যয় পরিচালনাও কঠিন হয়ে পড়ে।
গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার একটি বেসরকারি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ জানান, আশপাশের বিদ্যালয়গুলোতে পাসের হার কমে যাওয়ায় এবার সম্ভাব্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে। পাশাপাশি পাস করা শিক্ষার্থীদের একটি অংশ জেলা শহর বা ভালো কলেজে যেতে চায়। ফলে গ্রামের কলেজে শিক্ষার্থী ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
শ্রীপুরের বরমী ডিগ্রি কলেজেও একই চিত্র। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে তিন বিভাগে মোট ৪০০ আসন থাকলেও এবার অর্ধেক আসন পূরণের মতো আবেদনও পড়েনি।
শিক্ষাবিদদের মতে, শুধু শিক্ষার্থী সংকট হিসেবে বিষয়টিকে দেখলে সমস্যার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না। দারিদ্র্য, বাল্যবিবাহ এবং শিক্ষার প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়াসহ নানা সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণেও শিক্ষার্থীদের একটি অংশ মাধ্যমিকের পর আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারছে না।
মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড, বরিশালের চেয়ারম্যান প্রফেসর আবু তাহের মোহাম্মদ রাশেদুল ইসলাম বলেন, মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলের কলেজগুলোতে শিক্ষার্থী সংকট ভবিষ্যতে আরও প্রকট হতে পারে। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণের হার কমার পাশাপাশি অনেক শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন অকালেই থেমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড, রাজশাহীর চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. শামীম আরা চৌধুরী মনে করেন, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া ঠেকাতে কারিগরি শিক্ষায় আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
তার মতে, বাল্যবিবাহ ও দারিদ্র্যসহ বিভিন্ন সামাজিক-অর্থনৈতিক কারণে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা থেকে ছিটকে যাচ্ছে। এ সমস্যা মোকাবিলায় সরকার, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। শিক্ষার্থীদের বাস্তবমুখী দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করা গেলে পড়াশোনার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের পথও তৈরি হবে।
২০২৬-২০২৭ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির প্রথম ধাপের ফল আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর রাত ৮টায় প্রকাশ হওয়ার কথা রয়েছে। এসএসসি ও সমমানের ফল, সংশ্লিষ্ট কলেজের যোগ্যতা, আসনসংখ্যা এবং শিক্ষার্থীর পছন্দক্রমের ভিত্তিতে কেন্দ্রীয়ভাবে ফল তৈরি করা হয়েছে।
এবারও একাদশে ভর্তির ক্ষেত্রে কোনো ভর্তি পরীক্ষা বা লটারি থাকছে না। মেধাক্রম, পছন্দক্রম ও আসনের প্রাপ্যতার ভিত্তিতেই কলেজে আসন বরাদ্দ দেওয়া হবে।
নীতিমালা অনুযায়ী, ২০ থেকে ২২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে চূড়ান্ত ভর্তি শেষ করার কথা রয়েছে। ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে সারা দেশে একাদশ শ্রেণির ক্লাস শুরু হওয়ার কথা।
এবার একাদশে ভর্তির মোট আসনের ৯৩ শতাংশ সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। বাকি ৭ শতাংশের মধ্যে ৫ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান এবং ২ শতাংশ শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও অধীন দপ্তর-সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সন্তানদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে।