মরিয়ম খাতুনের আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলামকে সন্দেহের বশে আসামি করে মামলা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মামলার বাদী এস এম মাসুম বিল্লাহ।
বুধবার ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. সেফাতুল্লাহর আদালতে এ মামলায় আপসনামা দাখিল করেছেন নিহত মরিয়মের বাবা ও মামলার বাদী এস এম মাসুম বিল্লাহ।
আদালতে তিনি জানান, আসামি গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলামের জামিনে তার কোনো আপত্তি নেই। শুনানি শেষে আদালত মাকসুদা ইসলামের জামিন মঞ্জুর করলেও গাজী নজরুল ইসলামের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন।
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি বলেন, আসামিপক্ষ বুধবার জামিনের আবেদন করে। এ সময় মামলার বাদী একটি আপসনামা দাখিল করেন। তবে প্রসিকিউশন পক্ষ থেকে জামিনের বিরোধিতা করা হয়। এ ধরনের মামলায় বাদীর আদালতে এসে আপসনামা দেওয়ার আইনগত সুযোগ নেই। মামলা হওয়ার পর তদন্তকারী কর্মকর্তা তদন্ত শেষে প্রতিবেদন দেবেন। আদালত আসামিকে জামিন দেবেন কি না, সেটি আদালতের নিজস্ব এখতিয়ার।
তিনি আরও বলেন, নারী আসামির বয়স ও অসুস্থতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আদালত মাকসুদা বেগমকে জামিন দিয়েছেন। তবে গাজী নজরুল ইসলামের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করা হয়েছে।
পাবলিক প্রসিকিউটর আরও বলেন, আসামিরা বাদীর নিকটাত্মীয়। তবে হলফনামার বিষয়টি দেখে মনে হয়েছে, কোনো না কোনোভাবে চাপের মুখে এটি তৈরি করা হয়ে থাকতে পারে। কেন এ ধরনের হলফনামা করা হয়েছে, সেটিও তদন্তে বেরিয়ে আসবে।
আপসনামার নথি অনুযায়ী, নিহত মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ এবং আসামিপক্ষের স্বজন আব্দুল হামিদ মোড়লের মধ্যে সমঝোতা দলিলটি সম্পাদিত হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, মরিয়মের সঙ্গে গাজী নজরুল ইসলামের বিয়ে হয়। বিয়ের পর নজরুল ইসলামের প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলামের সঙ্গে মরিয়ম দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে সদ্ভাব বজায় রেখে সংসার পরিচালনা করে আসছিলেন।
গত ২০ সেপ্টেম্বর ঢাকার বাসভবনে মরিয়ম আত্মহত্যা করেন। মেয়ের জামাইয়ের বাসায় আত্মহত্যার ঘটনা ঘটায় তাৎক্ষণিকভাবে সন্দেহের বশে তার বাবা শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেন। ওই মামলায় গাজী নজরুল ইসলাম, তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলাম ও অন্য একজনকে আসামি করা হয়।
আপসনামায় আরও বলা হয়েছে, পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন মাধ্যমে খোঁজখবর নিয়ে বাদী নিশ্চিত হয়েছেন যে, গাজী নজরুল ইসলাম বা মাকসুদা ইসলামের কোনো প্ররোচনা কিংবা কর্মকাণ্ডের কারণে রাগ বা অভিমানে মরিয়ম আত্মহত্যা করেননি। দুই পরিবারের মধ্যে আগে থেকেই নিকটাত্মীয়তার সম্পর্ক থাকায় উভয় পক্ষের সম্মতিতে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে আপসনামাটি করা হয়েছে।
আপসনামার শর্ত অনুযায়ী, গাজী নজরুল ইসলাম ও মাকসুদা ইসলাম আদালত থেকে জামিন পেলে বাদী বা তার পরিবারের কোনো আপত্তি থাকবে না। জামিনের পর উভয় পক্ষ সৌহার্দ্যপূর্ণ ও আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখবেন। পাশাপাশি বিচারাধীন বিষয়ে উভয় পক্ষ নিরপেক্ষ থেকে বিচার কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবেন।
এর আগে ২০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানাধীন ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর ভবনের তৃতীয় তলার ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাট থেকে গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের (১৯) ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
এ ঘটনায় মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেন। মামলায় গাজী নজরুল ইসলাম, তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগম এবং মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়।
মামলায় গ্রেপ্তারের পর ২১ সেপ্টেম্বর গাজী নজরুল ইসলামের চার দিন এবং মাকসুদা ইসলামের এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। রিমান্ড শেষে ২২ সেপ্টেম্বর মাকসুদাকে কারাগারে পাঠানো হয়। ২৩ সেপ্টেম্বর মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকে কারাগারে পাঠানো হয়।
চার দিনের রিমান্ড শেষে ২৪ সেপ্টেম্বর গাজী নজরুল ইসলামকে ফের চার দিনের রিমান্ডে পাঠানো হয়। পরে ২৮ সেপ্টেম্বর তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
এর আগে গত জুলাইয়ে মরিয়ম খাতুনের সঙ্গে গাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত মুহূর্তের কয়েকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তাকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ২২ জুলাই সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়, সাংগঠনিক তদন্তে তার নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হওয়ায় গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকে জানানো হয়।
এদিকে ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর অনৈতিক সম্পর্কের প্রতিবাদ এবং ভিডিও ফাঁসের সন্দেহে মারধর ও শ্বাসরোধ করে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে ২১ জুলাই পল্লবী থানায় মামলা করেন গাড়িচালক ও মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমান। ওই মামলায় হাইকোর্ট থেকে ১০ আগস্ট আট সপ্তাহের জামিন পান গাজী নজরুল ইসলাম।
সেই মামলার বাদী ওবায়দুর রহমানকেই পরবর্তী সময়ে মরিয়ম খাতুনের আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় আসামি করা হয়।
মামলার এজাহারে বাদী উল্লেখ করেন, গত জুনে গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে ভিকটিম মরিয়মের ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী বিয়ে হয়। সংসদ সদস্য হওয়ায় গাজী নজরুল ইসলাম, তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলাম ও মরিয়ম শেরেবাংলা নগর থানাধীন মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ এলাকায় সংসদ ভবনের বিপরীতে ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর ভবনের তৃতীয় তলায় বসবাস করতেন।
এজাহারে আরও বলা হয়, আসামি ওবায়দুর রহমানের প্রত্যক্ষ প্ররোচনায় গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে মরিয়মের বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রী বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মরিয়মকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতেন বলে মরিয়ম বিভিন্ন সময় মোবাইল ফোনে তার পরিবারকে জানিয়েছিলেন।
এর ধারাবাহিকতায় ২০ সেপ্টেম্বর বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে গাজী নজরুল ইসলাম মরিয়মের বাবাকে ফোন করে দ্রুত তাদের বাসায় যেতে বলেন। সেখানে গিয়ে তিনি অনেক লোকজন দেখতে পান। পরে জানতে পারেন, বাসার একটি কক্ষে মরিয়ম ওড়না দিয়ে ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফাঁস দিয়ে ঝুলছেন।
পুলিশের সহায়তায় দরজা ভেঙে মরিয়মের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ সময় বিছানার ওপর তার লেখা একটি সুইসাইড নোট পাওয়া যায় বলেও মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাদীর অভিযোগ, আসামিদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে এবং তাদের প্ররোচনায় মরিয়ম আত্মহত্যা করেছেন।