নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশে আবারও ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়েছে হাম। একসময় প্রায় নিয়ন্ত্রণে চলে আসা এই সংক্রামক রোগে চলতি বছর আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জনস্বাস্থ্য ও টিকা বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২০ সালের পর দেশব্যাপী হাম-রুবেলা (এমআর) টিকাদান ক্যাম্পেইন নিয়মিত না হওয়া এবং শিশুদের মধ্যে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধক্ষমতার ঘাটতি তৈরি হওয়াই বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম কারণ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিয়মিত টিকাদানের পাশাপাশি নির্দিষ্ট বয়সী শিশুদের জন্য প্রতি চার বছর পরপর বিশেষ এমআর টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনার পরিকল্পনা ছিল। ২০২৪ সালে এই কর্মসূচি হওয়ার কথা থাকলেও বিভিন্ন কারণে তা বাস্তবায়ন হয়নি। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ক্যাম্পেইন শুরুর পরিকল্পনা থাকলেও সেটিও বাস্তবায়িত না হয়ে ওই বছরের নভেম্বরে টাইফয়েডের টিকা কর্মসূচি পরিচালিত হয়।
দীর্ঘ সময় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি না হওয়ায় শিশুদের মধ্যে প্রতিরোধক্ষমতার ঘাটতি তৈরি হয়। এরই মধ্যে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে নতুন করে হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হলে অতি সংক্রামক এই ভাইরাস দ্রুত বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে ১০১ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ২১ হাজার ২১২ জন। তবে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি—৯৯৫ জন। উপসর্গ নিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা ১ লাখ ৮৮ হাজার ৪১ জন বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রাদুর্ভাব তীব্র হওয়ার পর ৫ এপ্রিল থেকে দেশের ১৮ জেলার ৩০টি উপজেলায় ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের জন্য বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা হয়। ২০ এপ্রিল থেকে কর্মসূচিটি দেশব্যাপী সম্প্রসারণ করা হয়। এতে ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
তবে মাঠপর্যায়ে সঠিক পরিকল্পনা বা মাইক্রোপ্ল্যানিংয়ের ঘাটতির কারণে অনেক শিশু কর্মসূচির আওতার বাইরে থেকে যায় বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। পরবর্তীতে ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইনের সময় দুই কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্যও সামনে আসে।
একই বয়সসীমার শিশুদের ক্ষেত্রে মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে টিকাদান কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ কোটি ৮০ লাখ, আর ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ২ কোটি ২৩ লাখ। অর্থাৎ দুই কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রায় ব্যবধান দাঁড়ায় ৪৩ লাখ।
হাম নিয়ন্ত্রণে টিকার পাশাপাশি আক্রান্ত শিশুদের আলাদা রাখার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, একজন আক্রান্ত শিশু থেকে একাধিক মানুষের মধ্যে দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই আক্রান্তদের আইসোলেশন নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রতিবেদনে প্রকাশিত একটি গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও কক্সবাজারের কয়েকটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ২০০ শিশু ও তাদের ১০০ মায়ের ওপর গবেষণা চালানো হয়। সেখানে দেখা যায়, আক্রান্ত শিশুদের ৫৯ দশমিক ৪ শতাংশ কোনো না কোনো স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র বা হাসপাতাল থেকে নতুন করে সংক্রমিত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাড়ি থেকে শুরু করে হাসপাতাল পর্যন্ত আক্রান্ত রোগীর জন্য পৃথক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে জ্বর বা হামের উপসর্গ দেখা দিলে শিশুকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখা এবং দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
টিকাদান কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের বিশেষ হাম টিকাদান কর্মসূচিতে ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলেও দুই মাস পর একই বয়সী শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ২ কোটি ২৩ লাখ।
এ বিষয়ে টিকা বিশেষজ্ঞ তাজুল ইসলাম বারী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে অসঙ্গতির বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তার মতে, বয়সসীমা পরিবর্তনের পরও আগের মতো লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা কতটা যুক্তিসংগত, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
ইপিআইয়ের পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হয়েছে, মাঠপর্যায় থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কর্মসূচি শেষ হওয়ার পরও টিকাদান অব্যাহত রাখা হয় এবং নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ২০ লাখ বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
হামে আক্রান্ত ও মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা নিয়েও রয়েছে তথ্যগত সীমাবদ্ধতা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া রোগীর সংখ্যা এবং উপসর্গের ভিত্তিতে চিকিৎসা পাওয়া রোগীর সংখ্যা আলাদাভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
রাজধানীর জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে (আইপিএইচ) নমুনা পরীক্ষা করা হলেও সব রোগীর নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব হয়নি। ফলে অনেক ক্ষেত্রে উপসর্গের ভিত্তিতে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে রোগী এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরিত হলে একই রোগীর তথ্য একাধিকবার সিস্টেমে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই সমস্যা সমাধানে ‘ভিপিডি সার্ভিলেন্স’ নামে একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে কেসভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ ও পর্যবেক্ষণ আরও সুনির্দিষ্ট করার চেষ্টা করা হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করলেই হাম নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। টিকার আওতার বাইরে থাকা শিশুদের শনাক্ত করে তাদের টিকাদান নিশ্চিত করার পাশাপাশি আক্রান্তদের দ্রুত পৃথক রাখা, হাসপাতালগুলোতে সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করা এবং সঠিক তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা ৫ বছরের বেশি বয়সী শিশুদের মধ্যেও সংক্রমণের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় টিকাদান ও জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোতে হামের রোগীদের জন্য পৃথক চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
হামের বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় টিকাদান, রোগী শনাক্তকরণ, আইসোলেশন, হাসপাতালের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ এবং নির্ভুল তথ্য সংগ্রহ—সবগুলো কার্যক্রম সমন্বিতভাবে পরিচালনা করা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।